আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তের চেকপয়েন্টে গত কয়েকদিন ধরে থমকে রয়েছে প্রায় ৩০০টি ট্রাক। এই ট্রাকগুলিতে বহন করা হচ্ছে র-পেট্রোলিয়াম কোক বা কাঁচা পেট্রোলিয়াম কোক, যা বিভিন্ন শিল্পকারখানার উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের শোধনাগারগুলি থেকে এই পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ করেই পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত এলাকায় ট্রাকগুলিকে আটকে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, ওপরমহলের নির্দেশেই নাকি এই পণ্যবাহী গাড়িগুলিকে আটকে রাখা হয়েছে। তবে, এই ধরনের পদক্ষেপের পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট লিখিত কারণ বা সরকারি নির্দেশনামা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছে রাজ্য প্রশাসন।
এই ঘটনার ফলে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন ট্রাক চালক, পরিবহনকারী এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প মালিকরা। দীর্ঘ সময় ধরে গাড়িগুলি সীমান্তে আটকে থাকায় একদিকে যেমন ব্যবসায়িক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে চালকদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। শিল্প মহলের মতে, পণ্য পরিবহনে এই ধরনের অঘোষিত বাধা সামগ্রিক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থাকে ভেঙে দিচ্ছে। বিশেষ করে যেসব শিল্পকারখানা এই কাঁচা পেট্রোলিয়াম কোকের ওপর নির্ভরশীল, তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতির জেরে বারোনি ক্যালসিনার্স অ্যাসোসিয়েশন সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে (পিএমও) চিঠি দিয়ে হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়েছে। সংগঠনের অভিযোগ, কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ ছাড়াই এই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করায় শিল্পজগতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। একদিকে যখন দেশের শিল্পোন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, তখন এই ধরনের বাধার সৃষ্টি হওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। আসামের শোধনাগারগুলো থেকেও পণ্য উৎপাদন ও পরিবহনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং শাসক দল বিজেপির নজর এড়িয়ে এই ধরনের ঘটনা কেন ঘটছে, তা নিয়ে শিল্প মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় শিল্পায়ন নিয়ে যে ধরনের প্রশ্ন উঠত, বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেই একই চিত্র ফুটে উঠছে কি না, তা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনার সুযোগ নিয়ে রাজ্য সরকারের সমালোচনা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে সামগ্রিকভাবে এই শিল্প সংকট নিরসনে দ্রুত কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ একান্ত প্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
উল্লেখ্য যে, পেট্রোলিয়াম কোক শিল্পক্ষেত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি কাঁচামাল। দীর্ঘ সময় ট্রাকগুলি আটকে থাকায় কাঁচামালের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন খরচও বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ছোট ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের পক্ষে এই বাড়তি আর্থিক বোঝা বহন করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। যদি দ্রুত এই সমস্যার সমাধান না হয়, তবে আগামী দিনে সংশ্লিষ্ট শিল্পক্ষেত্রগুলোতে কাজ বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত রাজ্য প্রশাসনের কর্তারা এখনও পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো সদুত্তর দেননি। কেন বা কোন উচ্চপদস্থ মহলের নির্দেশে এই ট্রাকগুলি আটকানো হয়েছে, সেই বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। পরিবহন মালিকদের বক্তব্য, তারা প্রয়োজনীয় সমস্ত নথিপত্র এবং চালান নিয়ে সীমান্ত পার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন, কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সীমান্ত রক্ষাকারী বা সংশ্লিষ্ট চেকপয়েন্টের কর্মীরা গাড়িগুলিকে ছাড়পত্র দিতে অস্বীকার করছেন। এই অচলাবস্থা কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না।
রাজ্যের শিল্প পরিকাঠামো এবং আন্তঃরাজ্য পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা যে বর্তমানে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে, এই ঘটনা তারই প্রতিফলন। শিল্পবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সীমান্ত বা আন্তঃরাজ্য বাধার এই ঘটনা বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এই বিষয়ে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী এবং পরিবহন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন। বারোনি ক্যালসিনার্স অ্যাসোসিয়েশন তাদের আবেদনে স্পষ্ট জানিয়েছে যে, জরুরি ভিত্তিতে এই পণ্যবাহী গাড়িগুলিকে গন্তব্যে পৌঁছানোর অনুমতি দেওয়া না হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির দায়ভার রাজ্য সরকারকেই নিতে হবে। সীমান্তে আটকে থাকা ৩০০টি ট্রাকের ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।







