রাজ্যে ক্যানসার চিকিৎসায় বড় ঘোষণা, দু’বছরে বাড়ছে ৭৫০টি শয্যা

পশ্চিমবঙ্গজুড়ে ক্যানসার চিকিৎসার পরিকাঠামোয় আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বর্তমান রাজ্য সরকার। রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও উন্নত, আধুনিক এবং সর্বজনীন করে তোলার উদ্দেশ্যে আগামী দুই বছরের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে আরও ৭৫০টি ক্যানসার চিকিৎসার শয্যা যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য দপ্তরের পক্ষ থেকে এই বিশেষ উদ্যোগের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যজুড়ে ক্যানসার আক্রান্ত হাজার হাজার রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে মনে করছে চিকিৎসক মহল ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

বর্তমানে প্রাপ্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যজুড়ে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে মোট ১,৮০০টি ক্যানসার বা অনকোলজি শয্যা রয়েছে। যার মধ্যে ১,২০০টি শয্যা বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে এবং ৬০০টি শয্যা সরকারি হাসপাতালের অধীনে রোগীদের সেবায় নিয়োজিত রয়েছে। তবে রাজ্যের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং ক্যানসারে আক্রান্তের হারের তুলনায় এই শয্যা সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য এবং অপর্যাপ্ত বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল। চিকিৎসা পরিষেবার এই ঘাটতি সাধারণ মানুষের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিজেপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রাজ্যের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে।

স্বাস্থ্য দপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন এই ৭৫০টি শয্যা পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও জেলা হাসপাতালগুলোতে যুক্ত করা হবে। এই উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য হলো কলকাতার বড় হাসপাতালগুলোর ওপর যে অতিরিক্ত চাপের সৃষ্টি হয়, তা কমিয়ে বিকেন্দ্রীকরণ করা। বিশেষ করে দূর-দূরান্তের গ্রামীণ এলাকা থেকে যে সমস্ত রোগীরা চিকিৎসার জন্য কলকাতায় ছুটে আসেন, তাদের যাতে বাড়ির কাছেই প্রয়োজনীয় পরিষেবা দেওয়া যায়, সেই লক্ষ্যে জেলাভিত্তিক ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোকে শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির আধুনিকীকরণের প্রক্রিয়াও একই সাথে শুরু হয়েছে।

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ শাসনকালে সরকারি হাসপাতালগুলোর পরিকাঠামোগত যে বেহাল দশা ছিল, তা কাটিয়ে একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেছে বর্তমান শাসক দল। রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের বর্তমান লক্ষ্য হলো, সাধ্যের মধ্যে অত্যাধুনিক ক্যানসার চিকিৎসা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। পরিকাঠামোর এই ব্যাপক উন্নয়নের ফলে ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের ওয়েটিং লিস্ট বা প্রতীক্ষার তালিকাভুক্ত সমস্যার সমাধান হবে এবং রোগীরা দ্রুত চিকিৎসা শুরু করার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি, ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত অত্যন্ত ব্যয়বহুল জীবনদায়ী ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত করতেও স্বাস্থ্য দপ্তর আলাদা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন শয্যা যুক্ত করার প্রাথমিক কাজ শুরু হবে। প্রথম দফায় কলকাতার নামী সরকারি হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত শয্যা বাড়ানোর কাজ সম্পন্ন হবে। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়ে ধাপে ধাপে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের জেলা হাসপাতালগুলোতে এই উন্নত চিকিৎসার সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হবে। পরিকাঠামো বাড়লেও চিকিৎসার মান বজায় রাখা এবং দক্ষ চিকিৎসক, অনকোলজিস্ট ও নার্সদের নিয়োগ নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের কাছে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। রাজ্যের প্রবীণ চিকিৎসকরা বর্তমান সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, সরকারি উদ্যোগে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক শ্রেণির রোগীদের চিকিৎসার খরচ অনেকটাই কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার পথ সুগম হবে।

এই প্রকল্পের বিস্তারিত খরচের হিসাব এবং কোন কোন হাসপাতালে কতগুলো করে শয্যা বাড়বে, তার চূড়ান্ত তালিকা খুব দ্রুত সরকারি পোর্টালে প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য ভবন। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য একটাই— রাজ্যের ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসার দৌড়ে যেন সময়ের অভাবে বা অর্থাভাবে কারও মৃত্যু না হয়। এই ৭৫০টি শয্যা যুক্ত হলে ক্যানসার চিকিৎসায় পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে অন্যতম সেরা এবং শক্তিশালী পরিকাঠামোর রাজ্য হয়ে উঠবে বলে আশাবাদী বর্তমান স্বাস্থ্য প্রশাসন। সামগ্রিকভাবে এই উদ্যোগ রাজ্যের স্বাস্থ্য মানচিত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করবে বলে আশা করা যাচ্ছে।