উত্তর কলকাতার বুকে ঘটে যাওয়া এক অত্যন্ত নিন্দনীয় ও উদ্বেগজনক ঘটনা শহরবাসীকে রীতিমতো স্তম্ভিত করে দিয়েছে। একজন পদ্মশ্রী সম্মানপ্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষকের ওপর এমন অমানবিক হামলার ঘটনায় গোটা রাজ্যে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। যে শহর তার সংস্কৃতির জন্য গর্বিত, সেখানে একজন জ্ঞানপিপাসু ও সমাজসেবী শিক্ষকের ওপর এই ধরনের আক্রমণ কেবল অপরাধই নয়, বরং সামাজিক অবক্ষয়ের এক চরম নিদর্শন।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে। দুই শিক্ষক সরকারি দায়িত্ব পালন শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। তাঁদের কাঁধে তখন জনগণনার মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কাজের দায়িত্ব ছিল। উত্তর কলকাতার একটি সরু রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎই ওপর থেকে নির্মাণাধীন বহুতলের ধ্বংসাবশেষ ও আবর্জনার স্তূপ তাঁদের ওপর এসে পড়ে। সৌভাগ্যবশত, বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি, তবে এই ঘটনাটি ছিল চরম গাফিলতির পরিচয়। যেকোনো মুহূর্তে ওই ভারী ইটের টুকরো বা সিমেন্টের চাপড়ায় তাঁদের প্রাণহানিও ঘটতে পারত।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার আকস্মিকতায় শিক্ষক দুজন হতবাক হয়ে যান। একজন প্রবীণ ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি স্বাভাবিকভাবেই ওই নির্মাণাধীন ভবনের শ্রমিকদের এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতার প্রতিবাদ করেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, পথচারীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত না করে কেন ওপর থেকে আবর্জনা ফেলা হচ্ছে? কিন্তু অভিযোগ, তাঁদের এই সৌজন্যমূলক প্রতিবাদ ওই শ্রমিকরা সহ্য করতে পারেননি। নির্মাণস্থলে উপস্থিত শ্রমিকরা অশালীন ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন এবং মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ওই শিক্ষক যখন নিজের স্মার্টফোনে ঘটনার প্রমাণ হিসেবে ভিডিও রেকর্ড করার চেষ্টা করেন, তখন এক শ্রমিক জোরপূর্বক তাঁর হাত থেকে ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁকে ধাক্কা দেওয়া হয় এবং শারীরিকভাবে হেনস্থা করা হয়। শুধু তাই নয়, ওই দুই শিক্ষককে অকথ্য ভাষায় আক্রমণ করে এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। একজন প্রবীণ পদ্মশ্রী প্রাপকের ওপর এই হেনস্থা স্থানীয় শিক্ষামহলে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার খবর জানাজানি হতেই এলাকায় তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। শিক্ষক দুজন সাহস দেখিয়ে স্থানীয় থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। তবে নির্মাণাধীন বহুতলের মালিক বা ঠিকাদারের পরিচয় নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়ে গিয়েছে। প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, ঠিকাদারকে তলব করা হবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শহরের নাগরিক নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও বড় করে উঠে এসেছে এই ঘটনার মাধ্যমে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, বর্তমান সময়ে শহর জুড়ে যে হারে নিয়ম বহির্ভূত নির্মাণ কাজ চলছে, তাতে সাধারণ মানুষের জীবন সবসময়ই ঝুঁকির মুখে থাকে। নিরাপত্তা বেষ্টনী বা জালে আবৃত না করেই বহুতল নির্মাণের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা প্রশাসনের চোখের সামনেই চলছে। অথচ এই ঘটনার পর প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগ উঠছে জোরালোভাবে।
রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র চাপানউতোর শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তিনি অভিযুক্তদের খুঁজে বের করে দ্রুত শাস্তির নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করে বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাজ্য সরকারের ব্যর্থতার দিকে আঙুল তুলেছেন। বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস—উভয় পক্ষই এই ঘটনাকে ইস্যু করে একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়েছে। শাসক দল বিজেপি অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য মেলেনি। পুলিশ জানিয়েছে, আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শহরের শিক্ষাবিদরা এবং সুশীল সমাজ এই ঘটনার দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, একজন শিক্ষক কেবল পাঠদান করেন না, তিনি সমাজের মেরুদণ্ড। তাঁর ওপর হামলা মানে গোটা সমাজের ওপর হামলা।
সবশেষে বলা যায়, এই ঘটনা নাগরিক সচেতনতা এবং প্রশাসনের নজরদারির অভাবকে আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। মানুষ এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের খবর শোনার জন্য। বিচারের বাণী যেন নিভৃতে না কাঁদে, সেদিকেই নজর রাখছে আপামর বাঙালি। শহর কলকাতার ঐতিহ্য এবং সম্মান রক্ষার্থে অভিযুক্তদের কঠোরতম শাস্তি হওয়া এখন সময়ের দাবি।








