কলকাতার ঐতিহ্যের অন্যতম ধারক, চিৎপুরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সুবিশাল নাখোদা মসজিদ আজ এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করল। শতবর্ষের এই যাত্রাপথ কেবল ইটের গাঁথুনি বা স্থাপত্যের নিদর্শন নয়, বরং এটি ধর্মীয় সম্প্রীতি, আধ্যাত্মিক সাধনা এবং জনসেবার এক অনন্য উপাখ্যান। একশো বছর আগে যে মহতী উদ্দেশ্যের হাত ধরে এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল, আজ তা মহীরুহে পরিণত হয়েছে। উত্তর কলকাতার ব্যস্ত জনপদে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপত্যটি আজও অগণিত মানুষের কাছে বিশ্বাসের এক অবিচল আশ্রয়স্থল হিসেবে টিকে রয়েছে।
শনিবার এই বিশেষ উপলক্ষকে কেন্দ্র করে মসজিদ প্রাঙ্গণে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছিল। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসংখ্য মানুষ এদিন অংশ নেন শতবর্ষের এই উদযাপনে। ঐতিহাসিকভাবে নাখোদা মসজিদের গুরুত্ব অপরিসীম। মুঘল স্থাপত্যশৈলীর আদলে তৈরি এই সুবিশাল গম্বুজ এবং মিনারগুলো বহু দশক ধরে কলকাতার আকাশরেখায় এক বিশেষ পরিচিতি বহন করে চলেছে। কেবল নামাজ পড়ার জায়গা হিসেবেই নয়, আর্তের সেবায় এবং সামাজিক সচেতনতা প্রসারেও এই প্রতিষ্ঠানটি এক উজ্জ্বল নজির স্থাপন করেছে। শহরের বহু সংকটময় মুহূর্তে নাখোদা মসজিদ সর্বদা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, যা আজও সর্বস্তরের মানুষের কাছে সমাদৃত।
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই বিশেষ দিনে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছেন। তিনি নাখোদা মসজিদকে কলকাতার সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রবীণ স্থানীয় বাসিন্দাদের স্মৃতিচারণায় উঠে এল অতীতের নানা অজানা অধ্যায়। কীভাবে একটি সাধারণ ধর্মীয় স্থান থেকে এটি জনকল্যাণমূলক কেন্দ্রে পরিণত হলো, তার বিস্তারিত বিবরণ দেন উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাঁর বার্তায় এই শতবর্ষের যাত্রাকে কলকাতার অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক বলে অভিহিত করেছেন। ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এবং বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস—উভয় শিবিরের প্রতিনিধিরাই আজ এই মসজিদে উপস্থিত হয়ে সম্প্রীতির বার্তাকে আরও জোরালো করেছেন।
মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শতবর্ষের এই উপলক্ষকে সামনে রেখে আগামী এক বছর ধরে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে বিনামূল্যে চিকিৎসাকেন্দ্র, শিক্ষা প্রসার এবং দরিদ্রদের অন্নদানের মতো প্রকল্প রয়েছে। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় যখন বিভাজনের সুর বারবার শোনা যায়, তখন নাখোদা মসজিদের এই শতবর্ষের পথচলা মানুষকে নতুন করে মানবিকতার পাঠ দিচ্ছে। স্থাপত্যের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এর অন্তনিহিত আধ্যাত্মিকতা আজও একইভাবে অমলিন। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের পদধূলিতে ধন্য হয় এই চত্বর। মানুষের বিশ্বাস, এই মসজিদ কেবল একটি কাঠামো নয়, এটি শহর কলকাতার আত্মা।
শতবর্ষের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত বহু মানুষ আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকে এই মসজিদের আঙিনায় বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতাই তাঁদের কাছে জীবনের বড় পাওনা। বিভিন্ন ধর্মের মানুষও এদিন এসে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মসজিদ কর্তৃপক্ষকে। সব মিলিয়ে আজ শহর কলকাতা সাক্ষী থাকল এক বিরল সম্প্রীতির মুহূর্তের। অনাগত দিনেও নাখোদা মসজিদ একইভাবে শান্তি ও সেবার বার্তা ছড়িয়ে দেবে, এমনটাই প্রত্যাশা শহরবাসীর। এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ইট যেন এক একটি গল্পের সাক্ষী, যা আগামীর প্রজন্মের কাছে এক মূল্যবান উত্তরাধিকার হিসেবে থেকে যাবে।
পরিশেষে, বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই মসজিদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরাই লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। আধুনিকতার চাকচিক্যেও যাতে প্রাচীন এই ঐতিহ্যের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। শতবর্ষের এই উদযাপনের মধ্য দিয়ে নাখোদা মসজিদ কেবল অতীতের ইতিহাসকেই স্মরণ করল না, বরং ভবিষ্যতের জন্য এক অটুট বন্ধনের অঙ্গীকারও গ্রহণ করল। শহরের এক অন্যতম প্রধান কেন্দ্রস্থল হিসেবে নাখোদা মসজিদ তার মহিমা ও গৌরব নিয়ে আগামী শতাব্দীতেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে, এটাই আজকের দিনের সম্মিলিত প্রত্যাশা।








