জম্মু-কাশ্মীরের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়লেন পশ্চিমবঙ্গের একদল পর্যটক। বুধবার সকালে জম্মু-শ্রীনগর জাতীয় সড়কে ঘটা এই দুর্ঘটনায় পর্যটকবাহী বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গেলে অন্তত ৩৩ জন যাত্রী গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। পর্যটন মরশুমের মাঝপথে এমন একটি ঘটনায় গোটা রাজ্য জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। উদ্ধারকার্যের পর আহতদের দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে, যেখানে তাঁদের শারীরিক অবস্থার ওপর চিকিৎসকরা কড়া নজর রাখছেন।
ঘটনার সূত্রপাত বুধবার সকালে। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে বাসটি যখন দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই চালক গাড়ির ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বাসটি রাস্তার পাশে একটি গভীর খাদে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাস্তার কিনারায় উল্টে গিয়ে থেমে যায়। এই দৃশ্য দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা তৎক্ষণাৎ আর্তনাদ শুনে ছুটে আসেন এবং উদ্ধারকাজে হাত লাগান। পরবর্তীতে কাশ্মীর পুলিশ এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দুর্ঘটনাকবলিত বাস থেকে আহতদের বের করে আনেন। আহত পর্যটকদের অধিকাংশের শরীরেই হাড়ের চোট এবং অভ্যন্তরীণ আঘাত রয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে খবর। কয়েকজন যাত্রীর অবস্থা সঙ্কটজনক হওয়ায় তাঁদের বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর পৌঁছাতেই প্রশাসনিক মহলে তৎপরতা শুরু হয়েছে। নবান্নের প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী গোটা ঘটনার ওপর নজর রাখছেন এবং জম্মু-কাশ্মীর প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে এবং প্রয়োজন হলে তাঁদের রাজ্য ফিরিয়ে আনার বিষয়েও রাজ্য সরকার সবরকম পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। পাশাপাশি, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন। রাজ্যের বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও এই দুর্ঘটনায় সমবেদনা জানানো হয়েছে এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য সবরকম সরকারি সহায়তার দাবি তোলা হয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের ধারণা, পাহাড়ি রাস্তায় বাসের গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণেই এই বিপত্তি। চালকের অসাবধানতা ছিল কি না, নাকি বাসের কোনো যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে এই ঘটনা ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখার জন্য ফরেন্সিক দল এবং তদন্তকারী আধিকারিকরা বাসটি পরীক্ষা করছেন। চালককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ আটক করেছে। এদিকে, পর্যটকদের পরিবারের সদস্যদের উৎকণ্ঠা কমানোর জন্য রাজ্য সরকারের একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল কাশ্মীর প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করছে। আহত পর্যটকদের পরিচয় সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে এবং তাঁদের নাম ও ঠিকানার তালিকা পাওয়ার পরপরই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পাহাড়ি এলাকায় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বিষয়টি বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। প্রতিটি বাঁকে ড্রাইভারদের সতর্ক থাকা এবং যান চলাচলের কঠোর নিয়ম মেনে চলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এই দুর্ঘটনার পর পর্যটন মহলে এক প্রকার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দুর্ঘটনার ফলে বেশ কিছুক্ষণ ওই হাইওয়েতে যান চলাচল স্তব্ধ হয়ে ছিল, যার ফলে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। যদিও বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার কাজ চলছে এবং উদ্ধারকারী দল এলাকা পরিষ্কার করার কাজ সম্পূর্ণ করেছে।
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি হেল্পলাইন নম্বর খোলার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে, যাতে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত খবর পেতে পারেন। প্রশাসনিক বার্তা অনুযায়ী, কোনো পর্যটকের পরিবারকে অযথা আতঙ্কিত হতে বারণ করা হয়েছে। আহতদের চিকিৎসার সব খরচ রাজ্য সরকার বহন করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। জম্মু-কাশ্মীরের স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত রক্ত এবং ওষুধের জোগান দেওয়ার জন্য প্রশাসনিক স্তরে যোগাযোগ করা হয়েছে।
পাহাড়ের পথে ভ্রমণের রোমাঞ্চ যেন অভিশাপ না হয়ে দাঁড়ায়, সেই বার্তা বারবার দেওয়া হলেও প্রতি বছরই এই ধরণের দুর্ঘটনার খবর আমাদের দুশ্চিন্তায় ফেলে। এখন সকলের একটাই প্রার্থনা, আহত পর্যটকরা যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসতে পারেন। পুরো ঘটনাটি নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত চলছে। ঘটনার পরবর্তী আপডেট এবং উদ্ধারকাজ সংক্রান্ত বিস্তারিত রিপোর্ট পাওয়া মাত্রই তা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা হবে বলে সরকারি প্রেস বার্তায় জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণাধীন এবং কাশ্মীরের প্রশাসন বাংলার পর্যটকদের সবরকম সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে। এই দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে পাহাড়ি রাস্তায় পর্যটকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করার দাবিও তুলছেন সচেতন নাগরিকরা।








