কলকাতা বিমানবন্দরের অন্দরে অবস্থিত প্রায় ১৩৬ বছরের পুরনো একটি মসজিদকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া আইনি জটিলতার বিষয়টি এবার গড়িয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের অন্দরে। দীর্ঘদিনের পুরনো এই উপাসনালয়টিতে ফের নমাজ পড়ার অনুমতি চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন মসজিদ কমিটির সদস্যরা। এই সংক্রান্ত মামলার প্রাথমিক শুনানি শুরু হলেও, নির্দিষ্ট সময়ের অভাবে তা এদিন আর শেষ করা সম্ভব হয়নি। আদালত সূত্রে খবর, আগামী ৭ অক্টোবর এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
বিমানবন্দর চত্বরে অবস্থিত এই মসজিদটি নিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই বিতর্ক ও আইনি টানাপোড়েন চলছে। মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে আর্জি জানানো হয়েছে যে, আইনি লড়াই বা বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়া চলাকালীনও যেন সেখানে নমাজ পাঠের অনুমতি বহাল রাখা হয়। তাদের দাবি, এটি একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং বহু বছর ধরে এখানে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়ে আসছে। আদালতের কাছে তারা মূলত অন্তর্বর্তীকালীন স্বস্তি বা ‘ইন্টেরিম রিলিফ’-এর আবেদন জানিয়েছেন।
তবে এই আবেদনের বিরোধিতা করেছে এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া বা এএআই। তারা জানিয়েছে, বিমানবন্দর এলাকা একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং নিরাপত্তার খাতিরে নিয়ন্ত্রিত এলাকা। সেখানে বাইরের লোকজনের অবাধ যাতায়াত বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। এএআই-এর আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তারা তাদের দাবির সপক্ষে প্রয়োজনীয় যুক্তি এবং নথি পরবর্তী শুনানির দিন আদালতে পেশ করবেন। তাদের মতে, সুরক্ষার বিধিনিষেধ এবং বিমানবন্দর পরিচালনার নিয়মের সঙ্গে এই বিষয়টি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা আদালত বিবেচনা করে দেখুক।
উল্লেখ্য যে, পশ্চিমবঙ্গ বর্তমানে বিজেপি শাসিত রাজ্য। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক ও আইনি পর্যবেক্ষকরা। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে ধর্মীয় অধিকারের সঙ্গে জড়িয়ে দেখার প্রচেষ্টা করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে। তবে বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ায় এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাব পড়ার কোনো অবকাশ নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞরা।
হাইকোর্টের বিচারপতিদের বেঞ্চে আজ এই মামলার শুনানি শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আদালতের ব্যস্ততা এবং সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে মামলার বিস্তারিত শুনানি সম্ভব হয়নি। দুই পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য শোনার আগেই শুনানি স্থগিত করে দেওয়া হয়। আগামী ৭ অক্টোবর ফের যখন আদালত বসবে, তখন এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে বিস্তারিত হলফনামা জমা দেওয়া হবে বলে জানা গিয়েছে। মসজিদ কমিটির আইনজীবীরাও নিজেদের দাবির সপক্ষে পাল্টা যুক্তি পেশ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বিমানবন্দর এলাকায় থাকা এই মসজিদটির বয়স ১৩৬ বছর বলে দাবি করছে মসজিদ কমিটি। কমিটির সদস্যদের দাবি, এই প্রাচীন স্থাপত্যটিকে সংরক্ষিত রাখা এবং সেখানে ধর্মীয় প্রার্থনা চালু রাখার আইনি অধিকার তাদের রয়েছে। কিন্তু এয়ারপোর্ট অথরিটি বা এএআই-এর পক্ষ থেকে যে আপত্তির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তাতে এই মামলার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের নজর এখন ৭ অক্টোবরের আদালতের সিদ্ধান্তের দিকেই। বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ধর্মীয় প্রার্থনার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত কোন আইনি পরিণতির দিকে যায়, তা দেখার অপেক্ষায় শহরবাসী।
আপাতত ৭ অক্টোবরের শুনানির জন্য সমস্ত পক্ষকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন কলকাতা হাইকোর্ট। নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে আদালত কী ধরণের নির্দেশ দেয়, তা এখন বড় প্রশ্নের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার— এই দুইয়ের ভারসাম্যের নিরিখেই আদালত তার চূড়ান্ত রায় প্রদান করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই মামলার যাবতীয় নথিপত্র এবং তথ্য এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য খুঁটিনাটি বিস্তারিত তথ্যাদি আপাতত আমাদের কাছে উপলব্ধ নেই। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।








