কলকাতা হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতিদের কড়া পর্যবেক্ষণের প্রেক্ষিতে অবশেষে টনক নড়ল নির্বাচন কমিশনের। রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত ‘এসআইআর’ বা ‘স্ট্যাটাস ইনফরমেশন রিপোর্ট’ নামক ডিজিটাল পোর্টালটিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং ব্যাপক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। মূলত বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং আদালতের নির্দেশাবলী যথাযথভাবে ও অক্ষরে অক্ষরে পালন করার লক্ষ্যেই এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রশাসনিক স্তরের নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবর পাওয়া গেছে।
এই পুরো ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল মুর্শিদাবাদের নির্বাচনী আবেদন সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি ঘিরে। মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্র থেকে দায়ের হওয়া নির্বাচনী আবেদনগুলির শুনানি চলছে মাননীয় বিচারপতি ইন্দ্রজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বেঞ্চে। শুনানির প্রতিটি পর্যায়ে বিচারপতি অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে এসআইআর পোর্টালের কার্যকারিতা এবং তার মধ্যে থাকা তথ্যের যথার্থতা ও নির্ভুলতা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছিলেন। বিচারপতি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন যে, পোর্টালে তথ্যের বিন্যাস এবং তা আপডেটের ধীরগতির প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু গুরুতর খামতি রয়েছে, যা বিচারপ্রক্রিয়াকে অহেতুক দীর্ঘায়িত করছে। এই পর্যবেক্ষণের পরই নির্বাচন কমিশনের আইনি প্রতিনিধিরা আদালতকে আশ্বস্ত করেন যে, পোর্টালে অতি দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সংশোধন করা হবে এবং তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।
সূত্রের খবর অনুযায়ী, পোর্টালটির মূল সফটওয়্যার কাঠামোতে বেশ কিছু আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর ফলে প্রতিটি জেলার রিটার্নিং অফিসাররা আরও দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে তথ্য আপলোড করতে সক্ষম হবেন। পাশাপাশি, আদালত যাতে সরাসরি এবং স্বচ্ছভাবে বিচার প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য মুহূর্তের মধ্যে দেখতে পায়, সেই ব্যবস্থাও সুনিশ্চিত করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ফলে বহু বছর ধরে ঝুলে থাকা নির্বাচনী মামলাগুলির নিষ্পত্তি দ্রুত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ আইন বিশেষজ্ঞরা।
বিচারপতি ইন্দ্রজিৎ চট্টোপাধ্যায় মুর্শিদাবাদের মামলাগুলির শুনানিতে যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আদালতের সক্রিয় হস্তক্ষেপ কতটা জরুরি, তা এই মামলার সামগ্রিক গতিপ্রকৃতি থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আদালত জানিয়েছে যে, কমিশনের এই সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলি ইতিবাচক। তবে, কেবল পোর্টাল পরিবর্তন করলেই হবে না, বরং তার কার্যকারিতা এবং উপযোগিতা আগামী দিনে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা-ও আদালত নিয়মিত খতিয়ে দেখবে বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, আগামী দিনে শুনানি প্রক্রিয়া যে দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে আদালত আশাবাদী। বিচারপতি ইন্দ্রজিৎ চট্টোপাধ্যায়ই এই মামলাগুলির শুনানি নিয়মিত চালিয়ে যাবেন বলে জানা গেছে। আপাতত নির্বাচন কমিশন এবং বিচারপতির মধ্যে এই সমন্বয়মূলক আলোচনা রাজনৈতিক মহলেও বেশ আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। যদিও বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে নির্বাচন কমিশন যদি পোর্টালটিকে ঢেলে সাজাতে পারে, তবে দীর্ঘদিনের জমে থাকা নির্বাচনী মামলাগুলোর দ্রুত নিস্পত্তি হওয়ার আশায় প্রহর গুনছেন সাধারণ মানুষ এবং সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা।
উল্লেখ্য যে, এসআইআর পোর্টালের এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন শুধুমাত্র মুর্শিদাবাদের নির্বাচনী মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, নাকি গোটা রাজ্যের বিধানসভা কেন্দ্রগুলোর জন্য কার্যকরী হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। কমিশনের প্রযুক্তিগত দল এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা এখন পোর্টালের আপডেটের কাজ নিয়ে দিনরাত ব্যস্ত রয়েছেন। আগামী শুনানির দিন কমিশন তাদের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে আদালতকে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। আদালত পোর্টালের এই পরিবর্তনের ওপর কতটা সন্তুষ্ট হয় এবং বিচারপ্রক্রিয়া আরও কতটা গতি পায়, তা জানতে এখন দেশের আইনজ্ঞ মহল ও ওয়াকিবহাল মহলের নজর পরবর্তী শুনানির দিকেই নিবদ্ধ রয়েছে। এই উদ্যোগ সফল হলে তা রাজ্যের নির্বাচনী বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।








