বিস্ময়কর এক ঐতিহাসিক প্রত্নবস্তুর সন্ধান মিলল এক সাধারণ পরিবারের ড্রয়ারে, যা বিশ্বজুড়ে শিল্প সংগ্রাহক এবং ইতিহাসবিদদের মধ্যে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ৫৫ বছর ধরে একটি সাধারণ আসবাবের কোণে অবহেলায় পড়ে থাকা হাতির দাঁতের তৈরি একটি ছোট দাবা ঘুঁটি শেষ পর্যন্ত নিলামে বিক্রি হলো আকাশছোঁয়া মূল্যে। প্রায় সাত লক্ষ পঁয়ত্রিশ হাজার পাউন্ড বা প্রায় আট কোটি টাকারও বেশি মূল্যে এই ঐতিহাসিক ঘুঁটিটি বিক্রি হওয়ায় বিশ্বজুড়ে শিল্প সংগ্রাহকদের মধ্যে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। এটি কেবল একটি খেলার সরঞ্জাম নয়, বরং মধ্যযুগের এক অবিস্মরণীয় ইতিহাসের সাক্ষী।
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৬৪ সালে। স্কটল্যান্ডের এডিনবরা শহরের এক অ্যান্টিক বা পুরনো সামগ্রী ব্যবসায়ী মাত্র পাঁচ পাউন্ডের বিনিময়ে এই ঘুঁটিটি কিনেছিলেন। সে সময় তিনি ঘুঁটিটির প্রকৃত গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ঘুঁটিটি ওই ব্যবসায়ীর পরিবারের সদস্যদের কাছে সাধারণ ঘরের সামগ্রী হিসেবেই ছিল। শো-কেসে বা ড্রয়ারের এক কোণে পড়ে থাকা এই ঘুঁটিটি যে এত মূল্যবান হতে পারে, তা তাদের কল্পনারও অতীত ছিল। সম্প্রতি যখন ব্যবসায়ীটির উত্তরাধিকারীরা বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনার জন্য এটি সামনে আনেন, তখনই জানা যায় যে, এটি বিখ্যাত ‘লুইস চেসম্যান’ বা ‘লুইস দাবা ঘুঁটি’ সংগ্রহের একটি দীর্ঘকাল ধরে হারিয়ে যাওয়া অংশ।
লুইস চেসম্যান বা লুইস দাবা ঘুঁটিগুলো বিশ্বখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের তালিকায় প্রথম সারিতে রয়েছে। ১৮৩১ সালে স্কটল্যান্ডের লুইস দ্বীপের উপকূলে বালি খুঁড়তে গিয়ে এই অসাধারণ ঘুঁটিগুলো প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছিল। ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, ১১৫০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে নরওয়ে বা আইসল্যান্ডের কারিগররা হাতির দাঁত ও সিন্ধুঘোটকের দাঁত নিখুঁতভাবে খোদাই করে এগুলো তৈরি করেছিলেন। এই সংগ্রহের অধিকাংশ ঘুঁটিই বর্তমানে ব্রিটিশ মিউজিয়াম এবং স্কটল্যান্ডের জাতীয় জাদুঘরে অত্যন্ত সুরক্ষিত অবস্থায় সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, গত কয়েক শতাব্দী ধরে এই সংগ্রহের কিছু ঘুঁটি নিখোঁজ ছিল, যা নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে ব্যাপক জল্পনা ছিল।
জানা গিয়েছে, এই সংগ্রহে মোট ৯৩টি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে খোদাই করা ঘুঁটি রয়েছে। নিলামে ওঠা এই বিশেষ ঘুঁটিটি একজন সশস্ত্র যোদ্ধার মূর্তির আদলে তৈরি, যাকে প্রত্নতাত্ত্বিক পরিভাষায় ‘ওয়ার্ডার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নিলামকারী সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘকাল পরিবারের ড্রয়ারে চরম অবহেলায় পড়ে থাকার পরেও ঘুঁটিটি তার প্রাচীন গৌরব, খোদাইয়ের সূক্ষ্মতা ও সৌন্দর্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। ৮.৯ সেন্টিমিটার উচ্চতাবিশিষ্ট এই ঘুঁটিটি দেখলে মনে হয়, যেন শত বছর আগের যোদ্ধার চোখে এখনো সেই শৌর্য ও বীরত্ব লেগে আছে।
তবে এই নিলামের পাশাপাশি আরও একটি তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, যা শিল্পরসিকদের কৌতূহলী করে তুলেছে। লুইস চেসম্যান সংগ্রহের মোট কতগুলি ঘুঁটি ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গিয়েছে, তা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। নিলামকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আজও এই কিংবদন্তি সংগ্রহের চারটি ঘুঁটির কোনো হদিশ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও হয়তো আজও এমন কোনো পরিবারের ড্রয়ারে বা শৌখিন আলমারিতে অযত্নে পড়ে রয়েছে এই অমূল্য প্রত্নসম্পদ। এই সম্ভাবনা প্রত্নতাত্ত্বিকদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে যে, ভবিষ্যতে হয়তো এমন আরও কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শনের দেখা মিলতে পারে।
এই নিলামের পর আন্তর্জাতিক শিল্প মহলে লুইস চেসম্যানের হারিয়ে যাওয়া অবশিষ্ট অংশগুলো খুঁজে বের করার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। নিলামে অংশগ্রহণকারী অনেক সংগ্রাহক মনে করেন, শিল্পমূল্যের নিরিখে এই ঘুঁটিটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। নিলামের চূড়ান্ত অংকটি বর্তমান বাজারে নিঃসন্দেহে একটি বড় রেকর্ড। বর্তমানে ওই ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্যরা এই অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তিতে বিস্মিত এবং আনন্দিত। তাদের কাছে এটি কেবল একটি পুরনো শখের বস্তু ছিল, কিন্তু আজ তা বিশ্বমানের প্রত্নতাত্ত্বিক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
এত দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত সাধারণ ও প্রতিকূল পরিবেশে সংরক্ষিত থেকেও কীভাবে ঘুঁটিটি প্রায় অক্ষত রইল, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা গবেষণা চালাচ্ছেন। ঘটনাটি প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে পুনরায় এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছে যে, ইতিহাসের অনেক অমূল্য নিদর্শন আজও সাধারণ মানুষের ঘরের অগোচরে রয়ে গিয়েছে, যার সঠিক মূল্যায়ন এখনো হওয়া বাকি। এই ঘুঁটির ক্রেতার নাম বা পরিচয় গোপনীয়তার স্বার্থে প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এটি হয়তো কোনো বড় সংগ্রাহকের সংগ্রহে জায়গা পেতে চলেছে, যেখানে এর উপযুক্ত যত্ন ও মর্যাদা নিশ্চিত হবে। এই ঘটনা যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি সাধারণ পুরনো জিনিসের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে ইতিহাসের এক অসাধারণ অধ্যায়।








