বাংলার কয়লাখনিতে আগের জমানায় ‘জঙ্গলরাজ’ ছিল, তোপ কিষাণ রেড্ডির

কেন্দ্রীয় কয়লা ও খনি মন্ত্রী জি কিষাণ রেড্ডি পশ্চিমবঙ্গের খনি শিল্প নিয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক বৈঠকে বিগত বামফ্রন্ট সরকার এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও বিস্ফোরক অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। শনিবার কলকাতায় আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় দাবি করেন যে, বিগত কয়েক দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের কয়লাখনি অঞ্চলগুলিতে একপ্রকার ‘জঙ্গলরাজ’ কায়েম ছিল। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই শাসনকালে কয়লাখনি এলাকাগুলি মূলত মাফিয়াদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল।

মন্ত্রী কিষাণ রেড্ডি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, অতীতে তৎকালীন শাসকদলের প্রত্যক্ষ মদত ও আশ্রয়ে খনি অঞ্চলগুলিতে কয়লা পাচার এবং অবৈধ উত্তোলনের এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। এর ফলে সরকারি কোষাগার যেমন বড় অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে, তেমনই সাধারণ মানুষ এবং খনি কর্মীরা চরম বঞ্চনা ও অনিরাপত্তার শিকার হয়েছেন। তিনি দাবি করেন, এই অবৈধ সিন্ডিকেট এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে খনি অঞ্চলের সুরক্ষা ও প্রশাসনিক কাঠামো সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছিল। তাঁর মতে, কয়লা বলয় মানেই তখন সাধারণ মানুষের কাছে ছিল ত্রাস ও শোষণের নামান্তর।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে কিষাণ রেড্ডি বলেন, রাজ্যে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের আমলে খনি শিল্পে আমূল পরিবর্তন আনার প্রচেষ্টা চলছে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হলো শিল্প ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনা এবং দুর্নীতির যাবতীয় শিকল ছিন্ন করা। মন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতায় রাজ্যের খনিগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে, যা বেআইনি খনন বন্ধ করতে এবং কর্মপরিবেশ উন্নত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এখন কয়লা উত্তোলনের হার যেমন ঊর্ধ্বমুখী, তেমনি সরকারি রাজস্ব জমার ক্ষেত্রেও অভূতপূর্ব স্বচ্ছতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

কিষাণ রেড্ডি আরও বলেন যে, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান প্রশাসন আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এবং বেআইনি কয়লা পাচারের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তি যাতে রাজ্যের খনি শিল্পের স্বাভাবিক কাজে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করতে না পারে, তার জন্য প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রীর মতে, অতীতে যে প্রশাসনিক অব্যবস্থা ও মাফিয়া রাজ খনি অঞ্চলের সামগ্রিক বিকাশে বাধার সৃষ্টি করেছিল, এখন তা ইতিহাস হতে চলেছে। বর্তমানে খনি অঞ্চলে সুশাসন ও প্রকৃত উন্নয়নের এক নতুন যুগ সূচিত হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর এই মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে যখন রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী পর্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে এবং তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে নানাবিধ দুর্নীতির অভিযোগ বারবার শিরোনামে উঠে আসছে, তখন মন্ত্রীর এই বয়ান রাজনৈতিক উত্তাপ অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন যে, অদূর ভবিষ্যতে এই খনি অঞ্চলগুলোতে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। যারা এতদিন অবহেলিত ও শোষিত ছিলেন, তারাই উন্নয়নের মূল সুফলভোগী হবেন।

পরিশেষে, জি কিষাণ রেড্ডি পশ্চিমবঙ্গকে দেশের খনি শিল্পের এক নতুন মানচিত্রে তুলে ধরার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, কেন্দ্রীয় সরকারের দূরদর্শী নীতি এবং রাজ্যের বর্তমান প্রশাসনের সক্রিয় সহায়তায় পশ্চিমবঙ্গ খনি শিল্পে ভারতের মধ্যে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করবে। তবে অতীতে ঘটে যাওয়া জঙ্গলরাজের তদন্তে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং বর্তমান সরকারের স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত শাসন নীতির ওপর পুনরায় বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর বক্তব্যে এটিই স্পষ্ট হয় যে, বর্তমান প্রশাসন অতীতের সমস্ত জঞ্জাল পরিষ্কার করে রাজ্যের খনি শিল্পকে এক নতুন ও গৌরবময় উচ্চতায় নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।