মালদা মেডিক্যালে তিন সপ্তাহে ৬০ শিশুর মৃত্যু, শোকের ছায়া জেলায়

মালদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিভাগে একের পর এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় গোটা রাজ্যজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য এবং উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। চলতি বছরের আগস্ট মাসের প্রথম তিন সপ্তাহে মোট ৬০ জন শিশুর অকাল প্রয়াণের খবর সরকারি সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই ঘটনা শুধু হাসপাতালের সুনামকেই ক্ষুণ্ণ করেনি, বরং রাজ্যজুড়ে স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিকাঠামো এবং কার্যকারিতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে। একদিনে ১০টি শিশুর মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনায় স্বাস্থ্য ভবনের শীর্ষ কর্তারাও নড়েচড়ে বসেছেন।

হাসপাতাল চত্বরে বর্তমানে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মৃত শিশুদের স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। হাসপাতালের প্রসূতি ও শিশু বিভাগে এখন এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কেন এত কম সময়ের ব্যবধানে এত সংখ্যক নিষ্পাপ প্রাণ ঝরে গেল, তা খতিয়ে দেখার জন্য স্বাস্থ্য দপ্তরের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্তকারী বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে। এই দলটিকে অতি দ্রুত বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বয়ান অনুযায়ী, মৃত্যুর শিকার হওয়া শিশুদের অনেকেরই শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক ছিল। বহু শিশুকে দূর-দূরান্তের বিভিন্ন ব্লক বা গ্রামীণ হাসপাতাল থেকে রেফার করে এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল। ভর্তির সময় থেকেই তারা মারাত্মক সংক্রমণ বা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছিল। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসার ধকল সহ্য করতে না পেরে শিশুদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে বলে হাসপাতালের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে এই যুক্তি মানতে নারাজ স্থানীয় বাসিন্দারা। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, হাসপাতালের শিশু বিভাগে পর্যাপ্ত পরিকাঠামো এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। বিশেষ করে নবজাতক ও শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা ‘এনআইসিইউ’-এর বেড সংখ্যা এবং অত্যাধুনিক সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে।

রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর বেহাল দশা নিয়ে শাসক ও বিরোধী দলের মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র দড়ি টানাটানি। রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য বিরোধী দল সরকারকেই দায়ী করেছে। তাদের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় যে অবহেলা ও অব্যবস্থাপনা চলে আসছে, তারই চরম প্রতিফলন এই মর্মান্তিক মৃত্যুমিছিল। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে কেবল প্রচারেই সীমাবদ্ধ থাকা হয়েছে বলে বিরোধী শিবিরের অভিযোগ।

অন্যদিকে, প্রশাসনিক স্তরেও কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সবরকম ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এবং শিশুদের চিকিৎসায় যাতে বিন্দুমাত্র গাফিলতি না হয়, তার জন্য তদারকি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চপদস্থ কর্তারা। বর্তমানে রাজ্যে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি চলছে, সেখানে এই ধরনের বিপর্যয় সরকারকে আরও বেশি চাপে ফেলেছে। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছিল, তবে মালদার এই ঘটনাটি মাত্রাতিরিক্ত হওয়ায় তা এখন জনমানসে ভীতি সঞ্চার করেছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল এই মুহূর্তে মালদা মেডিকেল কলেজে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। তারা দেখছেন, চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না কিংবা সংক্রমণের উৎস কোথায়। হাসপাতালের পরিকাঠামোগত ত্রুটি দূর করতেও বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এবং মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত রিপোর্ট এখনও প্রস্তুত হয়নি। তদন্তকারী দল তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং খুব শীঘ্রই সত্য সামনে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত হাসপাতালের সমস্ত জরুরি পরিষেবার ওপর কড়া নজরদারি রাখার জন্য জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মালদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, কোনোভাবেই যাতে শিশুদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে অবহেলা না হয়। সরকারের মূল লক্ষ্য এখন আর কোনো শিশুর প্রাণ যাতে অকালে ঝরে না যায়, তা নিশ্চিত করা। সাধারণ মানুষের দাবি, দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হোক। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য প্রশাসন সবরকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে বর্তমান এই শোকের মুহূর্তে স্বজনহারা পরিবারগুলোর জন্য কোনো সান্ত্বনাই যে যথেষ্ট নয়, তা বলাই বাহুল্য। পুরো বিষয়টি এখন রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রতিটি পদক্ষেপে কড়া নজরদারিতে রয়েছে।