কলকাতার দুর্গাপূজার মানচিত্রে নিউ আলিপুরের সুরচি সঙ্ঘ বরাবরই এক বিশেষ পরিচিতি বহন করে। তবে চলতি বছরের শারদোৎসবে এই পূজা মণ্ডপটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কারণে। রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড়সড় পরিবর্তনের পর, এবার সুরচি সঙ্ঘের দুর্গাপূজার মূল ভাবনা বা থিম হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা তথা বিশিষ্ট বাঙালি চিন্তাবিদ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও আদর্শকে। রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই উদ্যোগকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
জানা গিয়েছে, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এবারের পূজার থিমের নাম রাখা হয়েছে ‘উৎস’। উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই মণ্ডপে দর্শনার্থীরা কেবল দুর্গাপ্রতিমার দর্শন পাবেন না, বরং একইসঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বর্ণময় ও ঘটনাবহুল জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় সম্পর্কেও জানতে পারবেন। মণ্ডপের অভ্যন্তরে বিভিন্ন শৈল্পিক উপস্থাপনা এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের একটি বিশেষ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। দেশভাগের সময়কার উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সেই সন্ধিক্ষণে তাঁর ভূমিকা ও দূরদর্শিতা কীভাবে বঙ্গভঙ্গ রোধে এবং বাংলার সংস্কৃতি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, তা এই মণ্ডপের বিভিন্ন শিল্পকর্মের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, একসময় এই পূজাকে ঘিরে তৃণমূল কংগ্রেসের আধিপত্য ছিল। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ মহলের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল এই পূজায়। কিন্তু রাজ্যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর, যখন বিজেপি বর্তমানে শাসক দল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে, তখন সুরচি সঙ্ঘের এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলে নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই থিম নির্বাচনের মাধ্যমে রাজ্যের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ও আদর্শের প্রতি এক প্রকার আনুগত্য বা শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করা হচ্ছে। যদিও পূজা কমিটির দাবি, এটি মূলত ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার একটি প্রয়াস মাত্র।
মণ্ডপের সাজসজ্জায় ঐতিহাসিক নথিপত্র এবং তথ্যের বিন্যাস অত্যন্ত নিপুণভাবে করা হয়েছে। দেশভাগের ভয়াবহ স্মৃতি এবং সেই সময়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেওয়া রাজনৈতিক অবস্থানগুলো কীভাবে বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেছিল, তা এখানে সচিত্র বর্ণনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। দুর্গাপূজার ঐতিহ্যবাহী আচারের সঙ্গে বাংলার ইতিহাসের এই মিশেল দর্শনার্থীদের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা হতে চলেছে বলেই আয়োজকরা মনে করছেন। মণ্ডপ প্রাঙ্গণে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে দেশাত্মবোধ ও ইতিহাস সচেতনতা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে করা হয়েছে।
ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে এমন আয়োজন সাম্প্রতিক সময়ের বঙ্গীয় রাজনীতির এক বড় পরিবর্তনকে চিহ্নিত করে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শাসনক্ষমতায় থাকা বিজেপির আদর্শিক গুরু হিসেবে পরিচিত শ্যামাপ্রসাদের প্রতি এই বিশেষ নজর রাজ্যের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাতাবরণে এক নতুন দিক উন্মোচন করেছে। তবে পূজা কমিটির তরফে বারবার বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রচার নয়, বরং একজন মহান বাঙালি ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধা জানানো। মণ্ডপটি পরিদর্শনের জন্য ইতিমধ্যেই শহরতলির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ভিড় করতে শুরু করেছেন। শারদীয় উৎসবে ইতিহাসের এমন উপস্থাপন কলকাতার পূজা সংস্কৃতিতে নিঃসন্দেহে এক নতুন সংযোজন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশাসনিক নিরাপত্তার দিকটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে যাতে দর্শনার্থীদের কোনো অসুবিধা না হয়। এই পূজা প্যান্ডেলটি কলকাতার এই বছরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল বলে মনে করা হচ্ছে।








