কলকাতার রাস্তায় সৌন্দর্যায়নের নামে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কি শিকেয় উঠছে? সম্প্রতি চিংড়িহাটা ফ্লাইওভারে একাধিক বাইক দুর্ঘটনার একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই শহরজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, ফ্লাইওভারের ওপর রং করা অংশে চাকা পিছলে পরপর তিনটি মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়ে যাচ্ছে। এই ঘটনার পর থেকেই সড়ক নিরাপত্তা এবং ফ্লাইওভারের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ব্যবহৃত রঙের গুণমান নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, উৎসবের মরশুমের আগে ফ্লাইওভারের দেওয়ালে এবং রাস্তার একাংশে যে রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়েছিল, তা থেকেই বিপত্তির সূত্রপাত। বিশেষ করে বৃষ্টি বা রাস্তার আর্দ্রতায় এই ধরনের রঙ রাস্তাটিকে পিচ্ছিল করে দিচ্ছে, যা দ্বি-চক্রযান চালকদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্য প্রশাসনের অন্দরমহলে অস্বস্তি বেড়েছে। খোদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই বিষয়ে রিপোর্ট তলব করতে পারেন বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। রাজ্যের বর্তমান শাসক দল বিজেপি এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অবশ্য এই নিয়ে সরব হয়ে সৌন্দর্যায়নের নামে সরকারি অর্থের অপচয় এবং মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে, রাস্তা তৈরির জন্য যে বিশেষ পিচ বা অ্যাসফল্ট ব্যবহার করা হয়, তার নিজস্ব ঘর্ষণ ক্ষমতা বা গ্রিপ থাকে। কিন্তু যখন সেই রাস্তার ওপরে অতিরিক্ত স্তরের রঙ বা রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করা হয়, তখন রাস্তার ওপরের ঘর্ষণ গুণাঙ্ক মারাত্মকভাবে কমে যায়। টায়ার এবং রাস্তার মধ্যবর্তী এই সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়ায় সামান্য ব্রেক চাপলেই বাইক চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন। বিশেষ করে বর্ষাকালে বা কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় এই সমস্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এমন পরিস্থিতিতে কলকাতা পুরসভা এবং কেএমডিএ-এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ নাগরিকরা।
ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে উচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারিকরা জানিয়েছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হতে পারে। সড়ক সুরক্ষার মান বজায় রাখার জন্য এখন থেকে ফ্লাইওভার বা রাস্তার সৌন্দর্যায়নে যে উপাদান ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে কঠোর নির্দেশিকা জারি করা হবে। রাস্তার ওপর প্রয়োগ করা রং কতটা পিচ্ছিল হতে পারে, তা পরীক্ষা করার জন্য ল্যাবরেটরিতে নমুনা পাঠানো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ পাওয়ার পরই ফ্লাইওভারের ওই অংশে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালে শহরের সৌন্দর্যায়ন প্রকল্পের কাজ জোরকদমে শুরু হয়েছিল, তবে সেই কাজের মান এবং নিরাপত্তার দিকটি কতটা যথাযথ ছিল, তা নিয়েও এখন নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে।
সূত্রের খবর, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ইঞ্জিনিয়ারদের দ্রুত ওই ফ্লাইওভার পরিদর্শন করতে বলা হয়েছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই একটি চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে। সেই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী আইনি বা কারিগরি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। আপাতত ওই অংশে যাতায়াতকারী বাইক চালকদের সাবধানতা অবলম্বন করার জন্য ট্র্যাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা প্রচার করা হচ্ছে। শহরের রাস্তায় সৌন্দর্য বাড়ুক, কিন্তু তা যেন মানুষের জীবনের মূল্যের চেয়ে বেশি না হয়, সেই দাবিই এখন জোরালো হচ্ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রথম অগ্রাধিকার এবং এতে কোনোভাবেই আপস করা হবে না। এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ মতামত সংগ্রহ করা হচ্ছে।








