পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে শাসক দল বিজেপির অন্দরে এবং বিরোধী দল তৃণমূলের সঙ্গে সংঘাতের আবহে এক নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় রাজ্য রাজনীতির পরিচিত মুখ এবং বিধায়ক কবীরকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠেছে। শুভেন্দু অধিকারীকে নিয়ে তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়ে রাজ্যজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, যার জেরে পরিস্থিতি সামাল দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। মূলত, রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর শারীরিক বা রাজনৈতিক অস্তিত্ব নিয়ে তাঁর করা একটি বিতর্কিত মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক শোরগোল ফেলে দেয়।
ঘটনার সূত্রপাত একটি জনসভা বা ঘরোয়া বৈঠকের আলাপচারিতাকে কেন্দ্র করে। সেখানে কবীর এমন কিছু শব্দ প্রয়োগ করেছিলেন যা শুভেন্দু অধিকারীর অনুগামী এবং শাসক দলের কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে। এই মন্তব্যের পরই বিরোধী দল তৃণমূলের তরফ থেকেও নানা মহলে অস্বস্তি তৈরি হয়। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে এবং জনরোষ থেকে বাঁচতে অতি দ্রুত নিজের সুর বদলে ফেলেন বিধায়ক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিজের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং আইনি বা দলীয় ঝামেলা এড়াতেই তিনি এমন ডিগবাজি খেয়েছেন।
নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে কবীর পরে জানান, তিনি যা বলেছেন তা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বরং তিনি এখন শুভেন্দু অধিকারীর দীর্ঘায়ু কামনা করে বলেছেন, তাঁর ইচ্ছা, আগামী দিনে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এই মন্তব্যটিও নতুন করে রাজনৈতিক মহলে হাসির খোরাক জুগিয়েছে। অনেকেই একে ‘রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা’ হিসেবে দেখছেন।
উল্লেখ্য, বর্তমানের এই উত্তাল রাজনৈতিক সময়ে, যেখানে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব পালন করছেন এবং তৃণমূল নেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে নিজের অবস্থান বজায় রাখছেন, সেখানে এ ধরনের উস্কানিমূলক মন্তব্যের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। কবীরের এই উল্টো সুরের পর অবশ্য বিজেপি নেতৃত্ব এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি। তবে স্থানীয় স্তরে দলের অন্দরে এই নিয়ে চাপা গুঞ্জন শুরু হয়েছে।
তৃণমূলের একাংশ কবীরের এই মন্তব্যকে কাপুরুষতা বলে কটাক্ষ করেছে। তাঁদের দাবি, একবার আক্রমণাত্মক কথা বলে পরে প্রধানমন্ত্রীর পদপ্রার্থী হিসেবে তুলে ধরা রাজনৈতিক দেউলিয়াপনার পরিচয়। অন্যদিকে, বিজেপি কর্মীরা বিষয়টি নিয়ে কোনো বিশৃঙ্খলা এড়াতে আপাতত চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করছেন। বিধায়কের এই আচমকা ভোলবদল নিয়ে বিরোধী শিবিরের পক্ষ থেকে নানারকম ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য শোনা যাচ্ছে।
সূত্রের খবর, এই গোটা ঘটনাটি নিয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব কবীরের কাছে ব্যাখ্যা চাইতে পারেন কি না, তা নিয়ে এখনও স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি। তবে এমন বিতর্কিত মন্তব্য থেকে যে তিনি নিজের অস্বস্তির জায়গা তৈরি করেছেন, তা বলাই বাহুল্য। এখন দেখার বিষয়, নিজের বক্তব্যের এই আমূল পরিবর্তনের পর তিনি কতটা জনগণের বা নিজের দলের আস্থা ফেরাতে পারেন। রাজ্যজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই মন্তব্য ঘিরে চরম চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় বিধায়ককে নিয়ে ট্রোলের বন্যা বয়ে যাচ্ছে।
পুরো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক মহলের দাবি, রাজনীতিকদের উচিত আরও সংযত ভাষা ব্যবহার করা। বিশেষ করে যখন রাজ্যের সাংবিধানিক পদাধিকারীদের নিয়ে মন্তব্য করার প্রশ্ন ওঠে, তখন ব্যক্তিগত আক্রমণের পরিবর্তে গঠনমূলক আলোচনা কাম্য। তবে কবীরের ক্ষেত্রে সেই সৌজন্য বজায় ছিল না বলেই মত প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। আগামী দিনগুলোতে এই ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোনো বড় প্রভাব ফেলে কি না, তা সময় বলবে। আপাতত কবীরের এই ‘ইউ-টার্ন’ রাজ্য রাজনীতির চর্চার কেন্দ্রে রয়েছে।








