পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাম্প্রতিক ক্যাবিনেট বৈঠকে রাজ্যের বিদ্যুৎ পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী এবং আধুনিক করার লক্ষ্যে তিনটি নতুন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাবে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি এবং রাজ্যের শিল্পায়নের গতিকে ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে রাজ্য সরকার এই বিশাল বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারি নথিপত্র এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর অনুযায়ী, এই তিনটি সুবৃহৎ প্রকল্পে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বিপুল বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদী শিল্প ও বাণিজ্য প্রসারের লক্ষ্যে এটি অত্যন্ত দূরদর্শী এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই নতুন প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের বিদ্যুৎ ঘাটতি অনেকটাই মিটবে বলে আশাবাদী বিশেষজ্ঞ মহল। বর্তমান সময়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্রমবর্ধমান শিল্প চাহিদা মেটাতে নিরবচ্ছিন্ন ও গুণমানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা রাজ্য সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যপূরণে এবং শিল্প বান্ধব পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে এই তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করবে। শুধু বৃহৎ শিল্প কারখানার ক্ষেত্রেই নয়, এই প্রকল্পের সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেও। যখন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন থাকে, তখন ছোট ও মাঝারি শিল্পের উৎপাদন ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে পরোক্ষভাবে রাজ্যের বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে এই বিনিয়োগ এক ইতিবাচক ও শক্তিশালী প্রভাব ফেলবে।
তবে এই প্রকল্পের জন্য নির্দিষ্ট স্থান এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের খুঁটিনাটি বিবরণ এখনও সরকারিভাবে পূর্ণাঙ্গ আকারে প্রকাশিত হয়নি। প্রকল্পগুলির ভৌগোলিক অবস্থান এবং নির্মাণের বিস্তারিত রূপরেখা নিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হবে বলে নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। বিশেষ করে, পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব কমানোর জন্য অত্যাধুনিক ‘সুপার-ক্রিটিক্যাল’ প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা দূষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখবে। রাজ্য সরকার একদিকে যেমন পরিবেশবান্ধব উপায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ভাবছে, অন্যদিকে তেমনি সাধারণ মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সাথে দেখছে।
উল্লেখ্য যে, গত কয়েক বছরে রাজ্যে শিল্প বিনিয়োগ টানতে রাজ্য সরকার একাধিক যুগান্তকারী নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি সেই ধারারই এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ৩০ হাজার কোটি টাকার এই বিনিয়োগের বিষয়টি দ্রুত নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলিকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং সরকারি যৌথ উদ্যোগে এই কাজ সম্পন্ন হতে পারে বলে প্রশাসনিক স্তরে আলোচনা চলছে। প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু হওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছেন রাজ্যের শিল্পমহল ও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। বিদ্যুৎ দপ্তর এবং শিল্প উন্নয়ন নিগমের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ তদারকি কমিটি গঠন করার পরিকল্পনাও সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে।
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শিল্প মানচিত্রে এই তিনটি নতুন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র মাইলফলক হয়ে থাকবে। সরকারের এই উদ্যোগ আগামী দিনের শিল্পায়ন এবং আর্থিক বিকাশে এক নতুন দিশা দেখাবে বলে মনে করছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। রাজ্যের দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ ঘাটতি মিটিয়ে একটি ‘পাওয়ার সারপ্লাস’ বা উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ রাজ্য হিসেবে নিজেদের অবস্থানকে আরও মজবুত করতে এই পরিকল্পনা কার্যকর ভূমিকা নেবে। প্রকল্পগুলির জমি অধিগ্রহণ অথবা দীর্ঘমেয়াদী লিজ সংক্রান্ত বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখার বিষয়টিও সরকার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দেখছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে দাবি করা হয়েছে। আগামিদিনে এই বিষয়ে আরও বিশদ তথ্য সরকারিভাবে প্রকাশ করা হবে। বর্তমানে প্রকল্পের প্রাক-প্রাথমিক কাজ, সমীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ছাড়পত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। রাজ্যবাসীর আশা, এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন পশ্চিমবঙ্গের শিল্প উন্নয়নে এক নতুন স্বর্ণযুগের সূচনা করবে।








