কলকাতায় বিজেপির তেরঙ্গা যাত্রা, মিছিলে উপচে পড়ল জনসমুদ্র

কলকাতার প্রাণকেন্দ্র আজ এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী থাকল। ভারতের স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে, দেশপ্রেমের আবহে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ‘হর ঘর তেরঙ্গা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ভারতীয় জনতা পার্টির উদ্যোগে আয়োজিত বর্ণাঢ্য ‘তেরঙ্গা যাত্রা’ শহরবাসীকে এক নতুন উদ্দীপনায় শামিল করল। রবিবার দুপুরের তপ্ত রোদ উপেক্ষা করে যেভাবে বিজেপি কর্মী ও সমর্থকদের ঢল নামল, তা রাজনৈতিক মহলের নজর কেড়েছে। মিছিলে অংশ নেন মহিলা ঢাকিরা । উপস্থিত ছিলেন মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও । উত্তর কলকাতার কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন বিজেপির উত্তর কলকাতা জেলা সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষ । এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী তাপস রায়, বিজেপি নেতা সজল ঘোষ, শঙ্কুদেব পণ্ডা-সহ একাধিক নেতা । যদিও তাঁদের দাবি, এ দিনের কর্মসূচি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের পক্ষে মানুষের ঐক্যের বার্তা বহন করছে ।মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের হাতে থাকা জাতীয় পতাকা এবং তাঁদের কণ্ঠে ধ্বনিত দেশাত্মবোধক স্লোগান গোটা পরিবেশকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছিল। শহরের উত্তর প্রান্ত থেকে মধ্য কলকাতা—সর্বত্রই যেন আজ তেরঙ্গার রঙে সেজে উঠেছিল।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, লোকসভা নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কলকাতার রাজপথে বিজেপির এই ধরনের কর্মসূচি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দলীয় সংগঠনকে চাঙ্গা করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই মিছিল একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মিছিলে উপস্থিত ছিলেন দলের একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতা, যাঁরা পথচলতি সাধারণ মানুষের মধ্যে দেশপ্রেমের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁদের মতে, স্বাধীনতা কেবল একটি দিন নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব ও পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

নিরাপত্তার খাতিরে এদিন সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে কঠোর পুলিশি নজরদারি ছিল। বিজেপির দলীয় পতাকার পাশাপাশি জাতীয় পতাকার প্রাধান্য মিছিলে এক অন্য উচ্চতা এনে দিয়েছিল। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং রাজ্য স্তরের নেতারা সামনের সারিতে থেকে মিছিলে নেতৃত্ব দেন। মিছিলে অংশগ্রহণকারী বহু কর্মী উৎসাহের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে পথে নামতে পেরে তাঁরা অত্যন্ত গর্বিত এবং এটি তাঁদের দেশসেবার অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করছে।

তবে কেবল দেশপ্রেমের বার্তা দেওয়াই এই যাত্রার একমাত্র লক্ষ্য ছিল না। মিছিলের সুর ও স্লোগানে সমসাময়িক বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু এবং রাজ্য সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে ‘নিট’ (NEET) পরীক্ষার জট, মেডিকেল ও শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে এদিন বিজেপি নেতারা সরব ছিলেন। মিছিলের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে ছোট ছোট জনসভায় নেতাদের বক্তব্যে সরকারি ব্যর্থতার প্রসঙ্গ বারবার উঠে এসেছে। দলের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে এবং মেধাবীদের অধিকার রক্ষার দাবিতে তাঁরা এই লড়াই আগামী দিনে আরও তীব্রতর করবেন।

শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাকে সচল রাখতে ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। মিছিলে প্রচুর মানুষের সমাগম হওয়ায় উত্তর ও মধ্য কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলোতে সাময়িক যানজট তৈরি হলেও, বিজেপির স্বেচ্ছাসেবকদের সুশৃঙ্খল তৎপরতা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মসূচির তুলনায় এদিন কর্মীদের মধ্যে যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখা গেছে, তা দলের সাংগঠনিক শক্তির একটি বড় ইঙ্গিত দেয়। নির্দিষ্ট রুট ধরে মিছিলটি এগিয়ে যায় এবং পূর্ব নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর পর তা সমাপ্ত হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আসন্ন দিনগুলিতে বিজেপি জনসংযোগের ওপর আরও বেশি জোর দিতে চলেছে। ‘হর ঘর তেরঙ্গা’ কর্মসূচিকে হাতিয়ার করে তারা প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। কলকাতায় এই ধরণের শক্তিশালী উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, সংগঠনকে তৃণমূল স্তর থেকে মজবুত করতে বিজেপি কোনো সুযোগই হাতছাড়া করতে রাজি নয়। এই মিছিলের মাধ্যমে তারা একদিকে যেমন নিজেদের শক্তির প্রদর্শন করেছে, অন্যদিকে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টাও অব্যাহত রেখেছে।

দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, পুরো কর্মসূচিটি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মিছিলের শেষে দলের নেতৃত্ব সংবাদমাধ্যমকে জানান, আগামী দিনেও দেশাত্মবোধক এবং জনস্বার্থবাহী একাধিক কর্মসূচি পালন করা হবে। সাধারণ মানুষ যেভাবে তাদের এই ‘তেরঙ্গা যাত্রা’য় সাড়া দিয়েছেন, তাতে দলের মনোবল অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। কলকাতার রাজপথে আজ গেরুয়া পতাকার পাশাপাশি জাতীয় পতাকার যে দৃশ্য দেখা গেল, তা আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই ওয়াকিবহাল মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। প্রশাসনিক সূত্র অনুযায়ী, কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। মিছিল শেষে কর্মীরা সুশৃঙ্খলভাবে এলাকা ত্যাগ করলে জনজীবন আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসে। সব মিলিয়ে, কলকাতার বুকে আজকের এই তেরঙ্গা যাত্রা রাজনৈতিক ও সামাজিক উভয় দিক থেকেই এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল।