বিজেপি বাংলা টার্গেট করলে দেশজুড়ে হারবে: মমতা

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিকে কড়া বার্তা দিলেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যদি বিজেপি বাংলা-কে টার্গেট করে, তবে তাদের দেশজুড়ে ক্ষমতা হারাতে হবে। এই মন্তব্য তিনি গতকাল একটি জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে করেছেন।

মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেছেন যে, তিনি বাংলায় চতুর্থবারের জন্য ক্ষমতায় আসবেন এবং তারপর দিল্লিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য বিরোধী দলগুলিকে একত্রিত করবেন। তাঁর এই বক্তব্য আসন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তীব্র সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে। সাম্প্রতিক রমনবমী উৎসবের সময় হওয়া হিংসার ঘটনা নিয়েও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, তাঁর দল পুনরায় ক্ষমতায় এলে এই ঘটনার বিচার হবে এবং দোষীরা শাস্তি পাবে।

গত লোকসভা নির্বাচনে এবং তার আগের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের উপর বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্ত ও তল্লাশি নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই সরব থেকেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, কেন্দ্রীয় সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে এই সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এবারের এই হুঁশিয়ারি তাঁর সেই অবস্থানকেই আরও জোরালো করল।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ভাষণে রাজ্যের উন্নয়নের একাধিক দিক তুলে ধরেন এবং বিগত বছরগুলিতে তাঁর সরকার যে সমস্ত জনকল্যাণমূলক প্রকল্প গ্রহণ করেছে, সেগুলির সাফল্য নিয়েও আলোচনা করেন। তিনি বলেন, “বাংলা সবসময় শক্তিশালী থেকেছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। আমাদের লড়াই শুধু বাংলার জন্য নয়, দেশের সকল মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াই।” তিনি আরও বলেন, “বিজেপি যা ভয় দেখাচ্ছে, তাতে কিছু হবে না। আমরা ভয় পাই না। আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।”

দলীয় কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আসন্ন নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রত্যেকটি ভোেট যেতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যেন তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল আসনে জয়লাভ করে। ” তিনি মনে করিয়ে দেন যে, “বাংলাকে ছোট করার চেষ্টা করলে, তার ফল তাদের ভালো হবে না।” তাঁর এই বক্তব্য রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান নতুন নয়। তবে, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরাসরি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তাঁর দীর্ঘদিনের। রমনবমী হিংসার ঘটনায় তিনি যেভাবে বিচার ব্যবস্থার উপর আস্থা রেখে দোষীদের শাস্তির আশ্বাস দিয়েছেন, তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এই জনসভার অন্যতম মূল আকর্ষণ ছিল তাঁর ‘দিল্লি চলো’ ডাক। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, শুধু রাজ্য নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও তৃণমূল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে চায়। বিরোধী দলগুলিকে একত্রিত করার তাঁর এই প্রয়াস আগামী দিনে কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলবে। তবে, তাঁর এই বার্তা জাতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী শক্তিগুলির জন্য একটি নতুন দিশা দেখাতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বক্তব্য আসলে বিজেপি-কে জাতীয় রাজনীতিতে কোণঠাসা করার একটি সুচতুর চাল। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, বাংলা-র মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যকে যদি বিজেপি আক্রমণ করে, তবে তার রাজনৈতিক মাশুল তাদের সারা দেশেই দিতে হবে। এই ভাষণের পর, রাজ্যের পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতেও নতুন করে মেরুকরণ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন যে, “আমরা শুধু ক্ষমতায় থাকার জন্য রাজনীতি করি না, মানুষের পাশে থাকার জন্য রাজনীতি করি।” তাঁর সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প, যেমন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, এবং কন্যাশ্রী-র মতো প্রকল্পগুলির উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, এই প্রকল্পগুলি রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনে পরিবর্তন এনেছে। এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে তিনি সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মন্তব্যগুলি শুধুমাত্র রাজনৈতিক ভাষণ নয়, বরং আগামী দিনের জাতীয় রাজনীতির একটি রূপরেখা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে বিজেপি-র বিরুদ্ধে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরার এক নতুন প্রয়াস চালাচ্ছেন। তাঁর এই বার্তা, দেশজুড়ে বিজেপি-বিরোধী শক্তিগুলোর কাছে একটি আহ্বান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। “বাংলার ঐক্যই হবে জাতীয় ঐক্যের শক্তি”, এই বলে তিনি তাঁর ভাষণ শেষ করেন।