নিউজ ডেস্ক: দল ভাঙা বা নতুন দল গড়ার রাজনীতি ভারতীয় গণতন্ত্রে নতুন কিছু নয়। তবে মুখের কথায় বা কয়েকজন বিধায়ককে পাশে নিয়ে নতুন দল ঘোষণা করলেই যে আইনি স্বীকৃতি মিলবে, বিষয়টা মোটেও তেমন নয়। দলত্যাগ বিরোধী আইনের বেড়াজালে জড়িয়ে যেকোনো মুহূর্তে ভেস্তে যেতে পারে বড়সড় রাজনৈতিক চাল। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরের সমীকরণ এবং বিধায়ক পদের আইনি ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষণ সামনে এসেছে। আইন কী বলে, কতজন বিধায়কের সমর্থন প্রয়োজন এবং দল থেকে বহিষ্কৃত হলেই কি বিধায়ক পদ চলে যায়?—আসুন দেখে নেওয়া যাক এই জটিল রাজনৈতিক অঙ্কের সহজ পাঠ।
দল ভাঙার আইনি অঙ্ক: দুই-তৃতীয়াংশের খেলা
আইন অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠিত দল ভেঙে নতুন দল গঠন করতে চাইলে বিধানসভায় সেই দলের মোট বিধায়ক সংখ্যার অন্তত *দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩)** গরিষ্ঠতার প্রমাণ দিতে হবে।
ধরা যাক, বর্তমানে তৃণমূলের বিধায়ক সংখ্যা ৮০ জন। এই পরিস্থিতিতে দল ভাঙতে হলে:
১. প্রয়োজনীয় বিধায়ক:** অন্তত **৫৩ জন** বিধায়কের লিখিত সম্মতি লাগবে।
২. স্পিকারের ভূমিকা:** দলত্যাগ বিরোধী আইন মোতাবেক, এই ৫৩ জন বিধায়ক যদি বিধানসভার স্পিকারের কাছে গিয়ে নিজেদের ‘প্রকৃত দল’ হিসেবে দাবি জানান, তবেই স্পিকার তাদের স্বীকৃতি দেবেন। অন্যথায় নয়।
৩. বিরোধী দলনেতার পদ ও ১০%-এর নিয়ম
বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী যদি ৫৩ জন বিধায়ককে একমঞ্চে আনতে পারেন, তাহলে সমীকরণটি বেশ আকর্ষণীয় মোড় নেবে-
১.বিরোধী দলনেতার পদ:** ৫৩ জন একজোট হলে তাদের মনোনীত সদস্যই বিরোধী দলনেতার পদ পাবেন।
২. সরকারের সহযোগী হলে: বিক্ষুব্ধরা যদি বিরোধী আসনে না বসে সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন করতে চায়, তবে তারা এই পদের দাবি নাও করতে পারে।
৩. অবশিষ্টদের ভাগ্য- টিযদি বিক্ষুব্ধরা দাবি না জানায়, তবে মূল দলের বাকি ২৭ জন বিধায়কও বিরোধী দলের মর্যাদা পাবেন না। কারণ, নিয়ম অনুযায়ী বিরোধী দলের মর্যাদা পেতে মোট আসন সংখ্যার *১০ শতাংশ (অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ৩০ জন) বিধায়ক থাকা জরুরি। ৮০ থেকে ৫৩ জন চলে গেলে বাকি থাকে মাত্র ২৭, যা প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে কম।
যদি সংখ্যা জোগাড় না হয়: কী হবে বহিষ্কৃতদের ভবিষ্যৎ?
যদি বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী প্রয়োজনীয় ৫৩ জন বিধায়ককে একত্রিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে মূল দলের আইনি স্বীকৃতি একদম অক্ষত থাকবে। এখন প্রশ্ন উঠছে, যারা বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন বা যাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হলো, তাদের ভবিষ্যৎ কী? তারা কি বিধায়ক পদ হারাবেন?
আইনি স্বস্তি: ইউনিট দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও আইন অনুযায়ী তাদের বিধায়ক পদ সাথে সাথেই খারিজ হয়ে যায় না।আনঅ্যাটাচড’ মেম্বার: বিধানসভার খাতায় তারা কোনো দলের সদস্য না থেকে *আনঅ্যাটাচড” (Unattached Member)** বা নির্দলীয় সদস্য হিসেবে পরিচিত হবেন।
কখন পদ যাবে?** তাদের বিধায়ক পদ তখনই খারিজে যোগ্য হবে, যদি তারা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন এবং তার উপযুক্ত নথিপত্র প্রমাণ হিসেবে পেশ করা যায়।
যদিও রাজনীতিতে ক্ষমতার অলিন্দে টিকে থাকতে গেলে শুধু জনসমর্থন বা ক্ষোভ থাকলেই চলে না, আইনি মারপ্যাঁচেও দড় হতে হয়। দলত্যাগ বিরোধী আইনের এই কঠোর নিয়মাবলী স্পষ্ট করে দেয় যে, দল ভাঙার খেলাটা যতটা সহজ মনে হয়, আইনি টেবিলে তা ততটাই জটিল।







