ভারতের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটানো এবং দেশের অর্থনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে ইথানল ও জৈব জ্বালানির বিকল্প ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রী নীতিন গড়কড়ি। একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেছেন যে, বিদেশ থেকে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর দীর্ঘদিনের এই নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশীয় পদ্ধতিতে উৎপাদিত জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই ভারতকে প্রকৃত অর্থে ‘আত্মনির্ভর’ করে তোলা সম্ভব। গড়কড়ির মতে, এই দূরদর্শী পদক্ষেপ কেবল পরিবেশ দূষণ রোধেই সহায়ক হবে না, বরং দেশের বিপুল পরিমাণ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ঘটিয়ে জাতীয় কোষাগারকে সমৃদ্ধ করবে।
বর্তমান সময়কার অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ভারত তার ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদার সিংহভাগই বিদেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে বাধ্য হয়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর তথ্যমতে, ভারত বর্তমানে প্রতি বছর জ্বালানি আমদানির পেছনে প্রায় ২২ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় করে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রতি বছর দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের বাজারে চলে যাওয়ার ফলে ভারতের জাতীয় অর্থনীতির কাঠামোয় এক বিরাট চাপের সৃষ্টি হয়। নীতিন গড়কড়ি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে মনে করেন, যদি এই ২২ লক্ষ কোটি টাকা সরাসরি ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতির পরিকাঠামোয় এবং পরিশ্রমী কৃষক সম্প্রদায়ের হাতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়, তবে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক চিত্র আমূল বদলে যাবে। তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন যে, ভারতের কৃষকদের এখন শুধু ‘অন্নদাতা’ হিসেবে গণ্য করাই যথেষ্ট নয়, বরং তাঁদের ‘জ্বালানি উৎপাদনকারী’ বা ‘এনার্জি প্রডিউসার’ হিসেবেও গড়ে তোলার সময় সমাগত হয়েছে।
ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির ব্যবহার ভারতের আধুনিক অটোমোবাইল শিল্পের জন্য একটি বৈপ্লবিক ও ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে বলে মন্ত্রী দাবি করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, কেন্দ্রীয় সরকার এমন এক বলিষ্ঠ ও সময়োপযোগী নীতি প্রণয়নের কাজে ব্যস্ত রয়েছে, যেখানে যানবাহনের ইঞ্জিনে ইথানলের ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি পাবে। এই পরিবর্তনের ফলে একদিকে যেমন পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর ভারতের নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমবে, অন্যদিকে বিষাক্ত ধোঁয়া ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণের মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে আসবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে উৎপাদিত বিভিন্ন কৃষিদ্রব্য থেকে জৈব জ্বালানি তৈরির প্রকল্পগুলোকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং কৃষকদের আয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
গড়কড়ি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন যে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং উদ্ভাবনী শক্তির মাধ্যমে ভারতের মোটরগাড়ি শিল্প বর্তমানে বিশ্বমানের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। তিনি গাড়ি প্রস্তুতকারক বিভিন্ন সংস্থাগুলিকে বিশেষ পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে তারা এমন ধরনের অত্যাধুনিক ইঞ্জিন তৈরির ওপর নজর দেয় যা ইথানল বা ফ্লেক্স-ফুয়েলে অতি সহজেই এবং দক্ষতার সঙ্গে চলতে পারে। মন্ত্রী অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছেন, ভারত যদি নিজের জ্বালানি নিজেই উৎপাদন করতে সক্ষম হয়, তবে তা ভারতকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করবে। এটি কেবলমাত্র একটি সাধারণ অর্থনৈতিক কৌশল নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি জাতীয় লক্ষ্য।
সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে বিভিন্ন স্তরে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। তবে কেবল গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, সাধারণ মানুষের মধ্যে ইথানল চালিত যানবাহনের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক জনসচেতনতা প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। দেশের তরুণ প্রজন্মের উদ্ভাবক এবং শিল্পপতিদের তিনি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন, জৈব জ্বালানির নিত্যনতুন উদ্ভাবন ও প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নির্মাণে যেন তাঁরা বিপুল বিনিয়োগ করেন। নীতিন গড়কড়ির এই বার্তা অত্যন্ত পরিষ্কার— ভারতের আগামী দিনের উন্নয়নের দীর্ঘ যাত্রা পুরোপুরি জ্বালানি স্বয়ংসম্পূর্ণতার ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হবে। এই সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় কৃষি এবং শিল্পের একীভূত মেলবন্ধনই হবে ভারতের আগামী দিনের অগ্রগতির আসল চাবিকাঠি। সামগ্রিকভাবে, ভারত এখন জ্বালানি সংকটের অন্ধকার কাটিয়ে স্বনির্ভরতার এক নতুন ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।








