ওইরেলযাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে এবং দূরপাল্লার যাত্রীদের যাতায়াত আরও সুগম করতে এবার অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ট্রেনের টিকিটের অনিশ্চয়তা বা কনফার্ম টিকিট না পাওয়ার ঝক্কি থেকে মুক্তি দিতে কলকাতা থেকে দেশের প্রধান শহরগুলোতে চালু হচ্ছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল ভলভো এবং স্লিপার বাস পরিষেবা। এখন থেকে আপনি চাইলে ট্রেন ছাড়াই বাস যোগে খুব সহজেই পৌঁছে যেতে পারবেন দিল্লি, বেঙ্গালুরু বা চেন্নাইয়ের মতো সুদূর গন্তব্যে।
দীর্ঘদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে, উৎসবের মরশুম হোক বা সাধারণ ছুটির দিন, ট্রেনের টিকিট পেতে নাভিশ্বাস ওঠে সাধারণ যাত্রীদের। ওয়েটিং লিস্টের দীর্ঘ তালিকার কারণে শেষ মুহূর্তে যাত্রা বাতিল করতে হয় বহু মানুষকে। এই সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেই সরকারি ও বেসরকারি পরিবহন সংস্থাগুলো যৌথভাবে এই নতুন রুটে বাস চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জানা গিয়েছে, এই বাস পরিষেবা মূলত সেইসব যাত্রীদের কথা মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করা হয়েছে, যারা শেষ মুহূর্তে টিকিটের নিশ্চয়তা পান না বা বিমানে যাতায়াত করা যাদের বাজেটের বাইরে।
বর্তমানে কলকাতা থেকে দিল্লি, বেঙ্গালুরু এবং চেন্নাইয়ের উদ্দেশ্যে বেশ কয়েকটি প্রিমিয়াম বাস পরিষেবা চালু করা হয়েছে। এই বাসগুলোতে রয়েছে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। আরামদায়ক আসন, পর্যাপ্ত লেগ-রুম, হাই-স্পিড ওয়াইফাই, চার্জিং পয়েন্ট এবং বিনোদনের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। লম্বা যাত্রাপথের ক্লান্তিকে দূর করতে বাসগুলোতে বিশেষ ধরনের ‘স্লিপার কোচ’-এর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যেখানে যাত্রীরা নিশ্চিন্তে শুয়ে যেতে পারবেন। এছাড়া নিরাপত্তার খাতিরে প্রতিটি বাসে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং অভিজ্ঞ চালক ও সহকারীর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পরিবহন দফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই বাসগুলোর সময়সূচী এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে যাত্রীরা খুব দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন। নিয়মিত বিরতিতে বাসের যাত্রাবিরতির জায়গা বা ‘স্টপেজ’গুলো এমনভাবে নির্বাচন করা হয়েছে যেখানে যাত্রীরা মানসম্মত খাবার এবং পরিচ্ছন্ন শৌচাগার ব্যবহারের সুবিধা পান। এই দীর্ঘযাত্রার পথে যাত্রীদের সুরক্ষার জন্য প্রতিটি বাসে দুজন চালক থাকছেন, যারা নির্দিষ্ট সময় অন্তর একে অপরের সঙ্গে দায়িত্ব অদলবদল করছেন। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কম থাকছে।
টিকিট বুকিংয়ের ক্ষেত্রেও আনা হয়েছে আধুনিকতা। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রীরা এখন অনায়াসেই এই বাসের টিকিট কাটতে পারছেন। ফলে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটার আর প্রয়োজন নেই। টিকিটের দাম ট্রেনের তুলনায় সামান্য বেশি মনে হলেও, জরুরি প্রয়োজনে এবং টিকিটের নিশ্চয়তার নিরিখে এই পরিষেবা সাধারণ মানুষের কাছে এখন প্রথম পছন্দ হয়ে উঠেছে।
এই রুটে বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনাও রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। যাত্রীদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে ভবিষ্যতে আরও নতুন নতুন রুটে এই ধরনের পরিষেবা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে বড় উৎসবের সময় যখন রেলের চাপ তুঙ্গে থাকে, তখন এই বাস পরিষেবা সাধারণ মানুষের ভরসার কেন্দ্র হয়ে উঠছে।
তবে এই পরিষেবার ক্ষেত্রে যাত্রীদের সচেতন থাকতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। টিকিট বুকিংয়ের সময় অনুমোদিত ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ব্যবহার করার অনুরোধ জানানো হয়েছে যাতে কোনো ধরনের প্রতারণার শিকার হতে না হয়। এছাড়া মালপত্র বহনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলার জন্যও যাত্রীদের জানানো হয়েছে।
কলকাতা থেকে দেশের অন্যান্য প্রান্তে যাতায়াতের জন্য ট্রেনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর এই উদ্যোগ সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় এখন আর ট্রেনের কামরায় দাঁড়িয়ে থাকার বা টিকিট না পাওয়ার চিন্তা করতে হবে না। আরামদায়ক সিটে বসে রাস্তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে অনায়াসেই পৌঁছে যাওয়া যাবে গন্তব্যে। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার এই উন্নতির ফলে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের মধ্যে সংযোগ আরও শক্তিশালী হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত হয়ে উঠছে আরও গতিশীল। আগামী দিনে আরও উন্নততর পরিষেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে পরিবহন সংস্থাগুলি, যা দীর্ঘপাল্লার যাত্রীদের কাছে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।






