কলকাতায় বাড়তে চলেছে ওয়ার্ড সংখ্যা, ২০০-র দিকে এগোচ্ছে পুরনিগম

কলকাতা পৌরনিগমের প্রশাসনিক মানচিত্রে বড় ধরনের রদবদলের ইঙ্গিত মিলছে। শহর কলকাতার বর্তমান ১৪৪টি ওয়ার্ডের গণ্ডি ভেঙে তা ২০০-য় নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকারি সূত্রের খবর অনুযায়ী, শহরের ২১টি বড় ওয়ার্ডকে একাধিক ভাগে ভাগ করার প্রস্তাব চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই পুনর্বিন্যাসের মূল উদ্দেশ্য হলো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রশাসনিক পরিষেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধা তদারকি আরও সুনিশ্চিত করা।

কলকাতা পৌরনিগমের এই নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শহরের ওয়ার্ড বিন্যাসে আমূল পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে যেসব ওয়ার্ডে জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যধিক, সেখানে প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করতেই এই ভাঙন প্রক্রিয়া। প্রতিটি বড় ওয়ার্ডকে খণ্ডিত করে প্রশাসনিক কাজের পরিধি ছোট করা হবে, যাতে কাউন্সিলর থেকে শুরু করে পুরকর্মীরা প্রতিটি এলাকার সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে পারেন। বর্তমানে শহরের জনঘনত্ব যেভাবে বাড়ছে, তাতে পুরাতন ওয়ার্ড ব্যবস্থায় পরিষেবা প্রদানে নানা সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এই সীমাবদ্ধতা কাটিকেই রাজ্য সরকার এবং পৌরনিগম কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ আলোচনার পর এই সিদ্ধান্তের পথে হেঁটেছে।

তবে এই প্রক্রিয়াটি কেবল ওয়ার্ডের সংখ্যা বাড়ানো নয়, এর পেছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। শহরের প্রতিটি প্রান্তের উন্নয়নের ভারসাম্য বজায় রাখতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব ওয়ার্ডকে ভাঙা হবে, সেখানে ভৌগোলিক সীমানা এবং জনসংখ্যার অনুপাত অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করার কাজ চলছে। এতে করে ভবিষ্যতে নির্বাচন পরিচালনার সময়ও সুবিধা হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের আধিকারিকরা।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ধরনের ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস সাধারণত প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের অঙ্গ। শহর যত বড় হচ্ছে, পরিষেবার চাহিদাও তত বাড়ছে। ১৪৪টি ওয়ার্ডের কাঠামো দীর্ঘদিনের পুরোনো। ফলে বর্ধিত জনসংখ্যার চাপ সামলাতে এই নতুন ২০০টি ওয়ার্ডের মডেল কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। তবে এই পরিবর্তনের ফলে ওয়ার্ডের সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ‘ডিলিমিটেশন’ প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষ। আগামী দিনে এই বিষয়ে বিস্তারিত বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়ার অপেক্ষা রয়েছে।

প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, শহরের দক্ষিণ ও উপকণ্ঠের ওয়ার্ডগুলিতেই এই ভাঙনের হার বেশি হতে পারে। কারণ, শহরের এই অংশগুলিতেই গত এক দশকে বসতি নির্মাণের গতি সবথেকে বেশি। যেসব এলাকায় বহুতল আবাসন প্রকল্পের সংখ্যা বেড়েছে, সেখানে ওয়ার্ডের প্রশাসনিক ক্ষেত্র ছোট করার বিকল্প নেই। বর্তমানে কলকাতা পৌরনিগমের এই সিদ্ধান্তের ফলে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক মহলে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নানামুখী আলোচনার জন্ম হয়েছে। ওয়ার্ড বাড়লে কাউন্সিলরদের কাজের চাপ যেমন কমবে, তেমনই উন্নয়নের রূপরেখাও আরও সুনির্দিষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় কত খরচ হতে পারে বা এর জন্য প্রশাসনিক পরিকাঠামো কতটা বদলাতে হবে, সেই সংক্রান্ত যাবতীয় খুঁটিনাটি তথ্য আপাতত জনসমক্ষে বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে পুরনিগম সূত্রের দাবি, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি কাজ করছে। যারা ওয়ার্ডের ভৌগোলিক বিন্যাস ও জনমিতির ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত নকশা তৈরি করবে। শহরবাসীর কাছে পরিষেবার মানোন্নয়নই এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য।

এই রদবদলের ফলে আগামী নির্বাচনের সমীকরণও কিছুটা হলেও পরিবর্তিত হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা। নতুন ওয়ার্ড বিন্যাস অনুযায়ী ভোটার তালিকা সংশোধন এবং বুথ স্তরের বিন্যাসেও বড় ধরনের বদল আসবে। তবে সাধারণ মানুষ আশা করছেন, রাজনৈতিক হিসাবের চেয়েও পরিষেবা প্রদানের গতিই যেন এই পরিবর্তনের আসল ভিত্তি হয়। এখন দেখার বিষয়, কত দ্রুত এই ২০০ ওয়ার্ডের নতুন মানচিত্র বাস্তবায়িত হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে খুব শীঘ্রই এই বিষয়ে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ করা হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।