নয়াদিল্লি: দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কলঙ্কমুক্ত করতে এবং সর্বভারতীয় স্তরে আয়োজিত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও পবিত্রতা বজায় রাখার লক্ষ্যে লোকসভায় পাশ হলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘পাবলিক এক্সামিনেশনস (প্রিভেনশন অফ আনফেয়ার মিনস) বিল’ বা পরীক্ষা জালিয়াতি বিরোধী আইন। দীর্ঘ বিতর্ক ও আলোচনার পর বুধবার সংসদের নিম্নকক্ষে এই বিলটি পেশ করা হয় এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তা গৃহীত হয়েছে। মূলত দেশের বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় বারবার প্রশ্নফাঁস, জালিয়াতি এবং দুর্নীতির যে অভিযোগ সামনে এসেছে, তার মোকাবিলায় এই নতুন কঠোর আইন অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা নেবে বলে মনে করছে কেন্দ্র সরকার।
নতুন এই আইনে অপরাধীদের জন্য অত্যন্ত কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এর আগে যে ধরণের অপরাধের জন্য অপেক্ষাকৃত লঘু শাস্তি বা আইনি ফাঁকফোকর ছিল, সংশোধিত এই বিলে তার মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং জরিমানার অঙ্কও অনেক গুণ বাড়ানো হয়েছে। কেন্দ্র সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, দেশের লক্ষ লক্ষ মেধাবী ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলবে, তাদের বিরুদ্ধে এই আইনের আওতায় কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তি বা চক্রকেই রেহাই দেওয়া হবে না। এমনকি, এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে কারাবাসের পাশাপাশি মোটা অঙ্কের জরিমানা দিতে হবে, যা কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
সংসদে বিলটি নিয়ে আলোচনার সময় বিরোধী পক্ষও এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে বিভিন্ন রাজ্যে যে ভাবে পর্যায়ক্রমে সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটছে এবং লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর শ্রম ও সময় নষ্ট হচ্ছে, তা নিয়ে সাংসদরা সরব হয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বিরোধী সদস্যদের আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, পরীক্ষার্থীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা রক্ষা করতে বর্তমান সরকার পূর্ণমাত্রায় বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত জালিয়াতি, হ্যাকিং বা অনৈতিক উপায়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার রুখতে বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থাও এই আইনের মাধ্যমে আরও জোরদার করা হচ্ছে।
তবে এই বিলের কার্যকারিতা কতটা মাঠ পর্যায়ে অনুভূত হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে। শিক্ষাবিদ ও পর্যবেক্ষকদের মতে, শুধু আইন পাশ করাই যথেষ্ট নয়, বরং পরীক্ষার আয়োজক সংস্থাগুলির প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় স্তরের নিয়োগ সংস্থাগুলিতে যে ধরনের পরিকাঠামোগত সংস্কারের দাবি দীর্ঘকাল ধরে উঠছে, তা এই আইনের মাধ্যমে কতটা পূর্ণ হবে, সে দিকে তাকিয়ে রয়েছে সারা দেশের অগণিত পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। সিস্টেমের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা অসাধু চক্রকে নির্মূল করতে প্রশাসনিক নজরদারি আরও নিবিড় করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিলটি পাস হওয়ার পরপরই লোকসভার অধিবেশন দিনের মতো মুলতবি ঘোষণা করেন অধ্যক্ষ। এদিন দুপুর থেকেই সংসদের অন্দরে এই বিল ঘিরে উত্তেজনার পারদ ছিল তুঙ্গে। বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে বেশ কিছু সংশোধনী প্রস্তাব আনা হলেও শেষ পর্যন্ত কণ্ঠভোটে বিলটি গৃহীত হয়। সরকারের দাবি, এই নতুন আইন বলবৎ হলে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার দুর্নীতির সাথে যুক্ত একটি বড় অংশ ভয়ের পরিবেশ অনুভব করবে। প্রশ্নফাঁসকারী চক্র, তাদের সাহায্যকারী এবং দুর্নীতির সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রত্যেকের ওপরই এই আইনের চাবুক পড়বে।
বর্তমানে আমরা যে ডিজিটাল যুগে বাস করছি, সেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনাগুলি এখন আর গতানুগতিক পদ্ধতিতে ঘটছে না। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে সাইবার অপরাধের নজির তৈরি হচ্ছে, তা সামাল দিতে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলির সমন্বয়কেও এই আইনের আওতায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামী দিনে এটি কার্যকর হলে দেশের কর্মসংস্থান বাজারে স্বচ্ছতা ফিরবে বলেই সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো দাবি করা হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, এই আইনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে হলে কেবল আইন প্রণয়ন নয়, বরং সঠিক প্রয়োগ এবং দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করলে তবেই এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের হার অনেকাংশে কমবে। আপাতত সংসদীয় প্রক্রিয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি পার হওয়ার পর এখন আইনটির আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশের অপেক্ষা মাত্র। এই বিলে সুনির্দিষ্টভাবে শাস্তির মাত্রা বা জরিমানার সঠিক পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যাদি পরবর্তী নির্দেশিকায় জানানো হবে। ভারতের শিক্ষা মানচিত্রকে দুর্নীতিমুক্ত করার লক্ষ্যে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।








