মহালয়ার মধ্যেই রাজ্যের ৫৫২ থানায় মিলবে ৪টি করে জরুরি সাড়া গাড়ি

রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও সুসংহত করতে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিকাঠামোয় নতুন মাত্রা যোগ করতে এবং পুলিশি ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করার উদ্দেশ্যে মহালয়ার পবিত্র তিথির আগেই রাজ্যের মোট ৫৫২টি থানায় চারটি করে নতুন অত্যাধুনিক জরুরি সাড়া দানকারী যান বা ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স ভেহিকল’ পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হতে চলেছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দপ্তরের পক্ষ থেকে প্রকাশিত তথ্যে জানানো হয়েছে, শারদীয়া দুর্গাপূজার প্রাক্কালে অপরাধ দমন, দুষ্কৃতীদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি প্রয়োজনে সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুত সাড়া দেওয়ার লক্ষ্যেই এই বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্যের পুলিশি ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এবং দ্রুতগতিসম্পন্ন করার দাবি উঠছিল বিভিন্ন মহল থেকে। সেই দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ জারি করেছেন। এই গাড়িগুলি মূলত প্রতিটি থানার অধীনস্থ এলাকাগুলিতে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি চালাবে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি কিংবা জরুরি ভিত্তিতে কোনো ফোন কল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই যানগুলি মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। বর্তমানে প্রতিটি থানায় যে সংখ্যক গাড়ি মজুত রয়েছে, তা ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ ও প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় বলে পুলিশ প্রশাসনের একটি বড় অংশ মনে করছে। এই পুলিশি লজিস্টিকসের ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যেই রাজ্য সরকারের এই জনমুখী ও নিরাপত্তামূলক উদ্যোগ।

সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, এই বৃহৎ প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নের জন্য রাজ্য পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। মহালয়ার পবিত্র তিথির মধ্যেই প্রতিটি থানার হাতে এই গাড়িগুলো তুলে দেওয়ার একটি কঠোর সময়সীমা বা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে নবান্ন। প্রতিটি গাড়িতেই অত্যাধুনিক ওয়্যারলেস ব্যবস্থা, জিপিএস ট্র্যাকিং বা উপগ্রহ ভিত্তিক অবস্থান নির্ণায়ক প্রযুক্তি এবং জরুরি উদ্ধারকাজের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত সরঞ্জাম মজুত থাকবে। এর ফলে সাধারণ মানুষ বিপদে পড়লে পুলিশের কাছ থেকে আগের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত এবং কার্যকর সাহায্য পাবেন বলে রাজ্য সরকার দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে রাজ্যের প্রশাসনিক পরিকাঠামো এবং আইনশৃঙ্খলার মান নিয়ে যে সমস্ত প্রশ্ন ও বিতর্ক উঠেছিল, তার প্রেক্ষিতে বর্তমানে বিজেপি সরকার সাধারণ মানুষের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিরোধী দল হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেস এই বিষয়ে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, সেদিকেও রাজনৈতিক মহলের বিশেষ নজর রয়েছে। তবে রাজ্য পুলিশ কর্মীদের একাংশের মতে, এই নতুন গাড়িগুলি তাদের কাজের গতি ও সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। পুলিশের লজিস্টিক সাপোর্ট বৃদ্ধি পেলে অপরাধী চক্রের ওপর নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি চালানো এবং তাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা পুলিশের জন্য অনেক বেশি সহজ হবে।

পুরুলিয়ার দুর্গম জঙ্গলমহল থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গের উচ্চ পার্বত্য এলাকা, কিংবা দক্ষিণবঙ্গের জনবহুল শহরতলি—প্রতিটি জায়গার স্বতন্ত্র ভৌগোলিক পরিস্থিতির কথা নিখুঁতভাবে মাথায় রেখেই এই গাড়িগুলোর মডেল নির্বাচন করা হয়েছে। বিশেষ করে গভীর রাতে এবং জনশূন্য এলাকায় এই গাড়িগুলোর নিয়মিত টহলদারি অপরাধমূলক প্রবণতা কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। পুজোর মরসুমে যখন রাজ্যে পর্যটকদের ভিড় বাড়তে শুরু করে এবং উৎসবের আমেজে রাজ্যের নিরাপত্তা বজায় রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, তখন পুলিশের এই বাড়তি তৎপরতা এবং প্রস্তুতি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত সহায়ক হবে।

আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই পর্যায়ক্রমে প্রতিটি জেলায় এই গাড়িগুলো পৌঁছাতে শুরু করবে বলে জানা গেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই স্পষ্ট নির্দেশ অনুযায়ী, যাতে কোনো একটি থানাও এই উন্নত পরিষেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, এই গাড়িগুলো চালানোর জন্য যোগ্য চালক নিয়োগ এবং নিরাপত্তারক্ষীদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে, রাজ্যের সুরক্ষাবলয়কে আরও সুদৃঢ় ও অভেদ্য করে তুলতেই এই বৃহৎ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। রাজ্যের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এই প্রচেষ্টা পুলিশ ও জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্ককে আরও মজবুত করবে বলেই বিশ্বাস প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের।