কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় আবাসন শিল্পে ফের জোরালো গতি ফিরে এসেছে, যা রাজ্যের অর্থনৈতিক চিত্রের এক উজ্জ্বল দিক উন্মোচিত করছে। লোকসভা নির্বাচনের সময় যে স্থবিরতা রিয়েল এস্টেট বাজারে লক্ষ্য করা গিয়েছিল, জুলাই মাসে তা এক নাটকীয় পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য ও বাজার সমীক্ষা অনুযায়ী, গত মাসের তুলনায় জুলাই মাসে কলকাতায় আবাসন নথিভুক্তকরণের হার প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আবাসন খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বাচন পরবর্তী স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি এবং গৃহঋণের সুদের হারের অনুকূল পরিবেশের কারণেই ক্রেতাদের মধ্যে বাড়ি কেনার প্রবণতা নতুন করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘদিন ধরে ঝিমিয়ে থাকা আবাসন বাজারে এই আকস্মিক বৃদ্ধি সংশ্লিষ্ট শিল্পমহলে যথেষ্ট আশার আলো দেখাচ্ছে। নির্বাচনের আবহে সাধারণ ক্রেতারা সাধারণত বড় ধরনের বিনিয়োগ বা দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক দায়বদ্ধতা থেকে বিরত থাকেন, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছিল গত কয়েক মাসের আবাসন বিক্রির পরিসংখ্যানে। তবে সেই অনিশ্চয়তার বাধা কাটিয়ে জুলাই মাস থেকে বাজার ফের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে। রাজ্যের বর্তমান পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আবাসন প্রকল্পের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সরলীকরণ করার উদ্যোগ এই বিক্রিবৃদ্ধিতে অত্যন্ত সহায়ক হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
প্রাক্তন সরকারের জমানার তুলনায় বর্তমানে রিয়েল এস্টেট শিল্পে নথিবদ্ধকরণের প্রক্রিয়া অনেক বেশি স্বচ্ছ ও গতিশীল হয়েছে বলে দাবি করছেন একাংশ অভিজ্ঞ বিল্ডার ও ডেভলপার। অতীতে আবাসন সংক্রান্ত একাধিক ক্ষেত্রে যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অভিযোগ উঠত, বর্তমানে সেই জায়গাটিতে আমূল পরিবর্তন আসায় সাধারণ মানুষ ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের মধ্যে নতুন করে উৎসাহ সঞ্চারিত হয়েছে। গত জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি সম্পত্তি নথিবদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি দীর্ঘ মেয়াদে রাজ্যের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কলকাতার মূল শহরের পাশাপাশি উপকণ্ঠের এলাকাগুলিতেও এই ইতিবাচক প্রবণতা অত্যন্ত স্পষ্ট। বিশেষ করে নিউ টাউন, রাজারহাট এবং দক্ষিণ কলকাতার ক্রমবর্ধমান আবাসন প্রকল্পগুলিতে ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনার হিড়িক লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। ক্রেতারা মূলত নিজেদের ব্যবহারের জন্য অর্থাৎ নিজস্ব বাসস্থানের প্রয়োজনে বাড়ি কিনছেন, যা থেকে এটি স্পষ্ট যে শহরের আবাসন চাহিদায় কোনো খামতি নেই, বরং চাহিদার পারদ ক্রমেই উর্ধ্বমুখী। বিনিয়োগকারীরাও এখন বাজারের এই ঘুরে দাঁড়ানোকে পুঁজি করে নতুন নতুন প্রকল্পে অর্থলগ্নিতে বিশেষ আগ্রহী হয়ে উঠছেন। রিয়েল এস্টেট সংস্থার কর্তাদের মতে, গৃহঋণের সুদের হার স্থিতিশীল থাকা এবং আবাসন প্রকল্পের সহজলভ্যতা বাজারের এই গতিকে আগামী দিনগুলিতে আরও ত্বরান্বিত করবে।
তবে এই জোয়ারের মধ্যেও কিছু ছোটখাটো চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে। নির্মাণ সামগ্রীর যেমন—রড, সিমেন্ট ও ইটের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি এবং দক্ষ শ্রমিক সংকটের মতো বিষয়গুলি অনেক ক্ষেত্রে আবাসন প্রকল্পের গতি ধীর করে দিতে পারে। এছাড়া, শহরতলি এলাকায় উন্নত জলনিকাশি ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পরিষেবা এবং অন্যান্য নাগরিক পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবি দীর্ঘদিনের। বর্তমান সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি এই বিষয়গুলিতে নিয়মিত নজরদারি বজায় রাখে, তবে আবাসন শিল্পের এই বর্তমান ইতিবাচক ধারায় কোনো ছেদ পড়ার সম্ভাবনা নেই। বরং আগামী উৎসবের মরশুমে, অর্থাৎ দুর্গাপূজা ও দীপাবলির প্রাক্কালে আবাসন বাজারে চাহিদা আরও বহুগুণ বাড়বে বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর কলকাতার আবাসন বাজার ফের লাভের মুখ দেখছে এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। উল্লেখ্য যে, গত মাসের তুলনায় এই ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি কেবল একটি নিছক পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি বাজারের সামগ্রিক চাহিদার এক বলিষ্ঠ প্রতিফলন। রাজ্যজুড়ে এখন নতুন নতুন পরিকাঠামো উন্নয়নের যে মহাপরিকল্পনা রূপায়িত হচ্ছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে আবাসন ক্ষেত্রটি আরও বেশি লাভজনক ও সুসংহত হয়ে উঠবে। ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষই এখন বাজারের বর্তমান পরিস্থিতির উপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন। নির্বাচনের ডামাডোল মিটে যাওয়ার পর ক্রেতাদের মধ্যে যে আগ্রহের অভাব বা দ্বিধা দেখা দিয়েছিল, তা জুলাই মাসে সম্পূর্ণভাবে দূর হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, বছরের বাকি সময়টাতেও আবাসন বাজার এই একই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারে কি না এবং অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে পারে কি না। এই স্থিতিশীলতা কেবল ব্যবসার জন্যই নয়, বরং আবাসন শিল্পের সাথে যুক্ত লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।








