কলকাতা হাইকোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশ রাজ্য রাজনীতির আঙিনায় এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ক্যামাক স্ট্রিট এলাকায় লাগানো বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের হোর্ডিং এবং বিলবোর্ড অপসারণের বিষয়ে যে আইনি লড়াই শুরু হয়েছিল, তাতে বড়সড় ধাক্কা খেল ঘাসফুল শিবির। কলকাতা হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতি এই মামলায় কোনো অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকার করায়, শহরজুড়ে রাজনৈতিক পোস্টার অপসারণের কাজ পুরোদমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হলো কলকাতা পুরসভার জন্য।
কলকাতা শহরের সৌন্দর্যায়ন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের দোহাই দিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে রাজনৈতিক হোর্ডিং সরানোর কাজ শুরু করেছে পুরসভা। তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি ছিল, তাদের দলের হোর্ডিংগুলি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং নিয়ম মেনেই লাগানো হয়েছিল। কিন্তু কলকাতা পুরসভার পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে যে, এই বিলবোর্ডগুলো বেআইনিভাবে এবং পুরসভার কোনো রকম অনুমতি ছাড়াই বসানো হয়েছে। এই বিরোধ যখন চরমে পৌঁছায়, তখন তৃণমূল কংগ্রেস আদালতের দ্বারস্থ হয়, কিন্তু বৃহস্পতিবারের শুনানিতে আদালত কোনো রক্ষাকবচ প্রদান করেনি।
বিচারপতি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে এই মামলার বিস্তারিত শুনানি প্রয়োজন। যতক্ষণ না উভয় পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি ও নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে, ততক্ষণ কোনো অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয়। আদালতের এই অবস্থানের ফলে কলকাতা পুরসভার হাতে এখন আর কোনো আইনি বাধা রইল না। ফলে পুরসভার কর্মীরা শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অবৈধ হোর্ডিং সরানোর কাজে আরও গতি আনতে পারবেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘটনাটি বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য এক বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজ্যের শাসক দল বিজেপি পরিচালিত প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নামা সত্ত্বেও কোনো প্রতিকার না পাওয়া দলটির কর্মীদের মনোবল কিছুটা হলেও প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশেই এই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে পুরসভার আইনজীবী মহল আদালতে দাবি করেছেন যে, শহরের নান্দনিকতা রক্ষা করা এবং পথচারীদের যাতায়াতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুরসভার নৈতিক দায়িত্ব। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ওপর আক্রমণের চেয়েও নিয়ম শৃঙ্খলা বজায় রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য।
ইতিমধ্যেই শহরের প্রধান রাস্তাগুলো থেকে রাজনৈতিক ব্যানার এবং কাটআউট সরানোর কাজ শুরু হয়ে গেছে। প্রশাসনের এই কঠোর মনোভাবে এটিই স্পষ্ট যে, ভবিষ্যতে যেকোনো রাজনৈতিক দলকেই তাদের প্রচারের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। যত্রতত্র হোর্ডিং লাগিয়ে শহরকে কদর্য করার প্রবণতার বিরুদ্ধে পুরসভার এই জেহাদ এখন আইনি বৈধতা পাওয়ার পথে।
উল্লেখ্য যে, পূর্ববর্তী বাম আমল বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের জমানার তুলনায় বর্তমান প্রশাসনে সরকারি জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়মাবলি অনেক বেশি কঠোর। কলকাতা পুরসভার তরফে সাফ জানানো হয়েছে, অনুমতিবিহীন যেকোনো কাঠামোই অবৈধ বলে গণ্য হবে, তা সে যে দলই হোক না কেন। হাইকোর্টের এই রায় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে একটি বার্তা যে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিশাল আকারের বিলবোর্ড লাগিয়ে জনমত তৈরির দিন হয়তো শেষ হতে চলেছে।
মামলার পরবর্তী শুনানি কবে হবে এবং সেই শুনানিতে আদালত কী চূড়ান্ত রায় দেয়, তা এখন সব মহলের নজরের কেন্দ্রে। তৃণমূল কংগ্রেসের আইনি প্রতিনিধিরা পরবর্তী শুনানির প্রস্তুতির জন্য নথিপত্র সংগ্রহ করছেন। অন্যদিকে, পুরসভা তাদের অবস্থানে অনড় থেকে শহর পরিষ্কার করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে, এই আইনি লড়াই কেবল হোর্ডিং অপসারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি রাজনৈতিক আধিপত্য এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের এক জটিল সমীকরণে পরিণত হয়েছে। আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছেন রাজ্যের সাধারণ নাগরিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আদালতের এই সিদ্ধান্তের ফলে আপাতত তৃণমূল কংগ্রেস বড় ধরনের ব্যাকফুটে চলে গেল, তা বলাই বাহুল্য। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে আইনি লড়াইয়ের পথে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারে কি না।








