পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার অন্তর্গত সন্দেশখালিতে ফের জমি দখল ও উচ্ছেদের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এবার কাঠগড়ায় বসিরহাটের ভারতীয় জনতা পার্টির বিধায়ক রেখা পাত্র। সন্দেশখালির একটি প্রান্তিক কৃষক পরিবারের অভিযোগ, তাদের পৈতৃক ভিটে থেকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে এবং তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র এলাকায়।
ভুক্তভোগী ওই কৃষক পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, বংশপরম্পরায় তারা ওই নির্দিষ্ট জমিতে চাষাবাদ করে আসছেন এবং সেখানেই তাদের বসতবাড়ি। কিন্তু সাম্প্রতিককালে বিধায়ক রেখা পাত্রের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং তাদের অনুগতরা বলপূর্বক ওই পরিবারকে তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ। অসহায় পরিবারটি বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় থানায় অভিযোগ জানিয়েও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো সুরাহা পায়নি, যা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের শাসক দল এবং বিরোধীদের মধ্যে নতুন করে তরজা শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনাকে সামনে এনে বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে। রাজ্যের শাসক দল তথা বিজেপির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের জমি দখলের এই অভিযোগকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন বিরোধীরা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধী পক্ষের দাবি, যারা অতীতে পরিবর্তনের কথা বলেছিল, তারাই আজ ক্ষমতা কুক্ষিগত করে সাধারণ মানুষের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে।
অন্যদিকে, বিজেপি বিধায়ক রেখা পাত্র যাবতীয় অভিযোগ সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন, কাল্পনিক এবং রাজনৈতিকভাবে তাকে ও তার দলকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য এই ধরনের চক্রান্ত করা হচ্ছে। তার দাবি, সন্দেশখালিতে উন্নয়নের কাজ ব্যাহত করতে বিরোধীরা মিথ্যে অভিযোগের বাতাবরণ তৈরি করছে। তবে বিধায়কের এই সাফাইয়ে সন্তুষ্ট নন স্থানীয় সাধারণ মানুষ।
এই ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ঘটনার পর থেকে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বজায় রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে হাতের বাইরে না বেরিয়ে যায়, সেজন্য এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে অভিযোগ, পুলিশি টহল সত্ত্বেও প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সন্দেশখালি গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি নাম। অতীতের বিভিন্ন ঘটনার জেরে বারবার সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছে এই অঞ্চলটি। বর্তমান শাসকের বিরুদ্ধে জমি দখলের এই নতুন অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। স্থানীয় কৃষকরা এখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের ভিটেমাটি ফিরে পাওয়ার দাবিতে সরব হয়েছেন। আগামী দিনে এই ঘটনা কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে সকলের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ অভিযুক্তদের দ্রুত শাস্তির দাবিতে পথ অবরোধের মতো কর্মসূচিও গ্রহণ করেছেন। যদিও কোনো এফআইআর কপি বা অন্যান্য দালিলিক প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও স্থানীয় রাজনৈতিক সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, এই ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি। প্রশাসনিক স্তরে সঠিক ও স্বচ্ছ তদন্ত না হলে আসল সত্য কখনোই সামনে আসবে না এবং সাধারণ মানুষের মনে যে অবিশ্বাসের বীজ বপন হয়েছে, তা দূর করা সম্ভব হবে না।
স্থানীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হলেও মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছে। সন্দেশখালির মাটি বারবার অশান্ত হচ্ছে জমি সংক্রান্ত বিবাদে, যা সাধারণ মানুষের জনজীবনের নিরাপত্তা এবং অস্তিত্বের সংকট তৈরি করছে। প্রশাসন যদি দ্রুত এই বিবাদ নিরসনে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করে, তবে আগামী দিনে পরিস্থিতি যে আরও অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাধারণ মানুষ এখন তাকিয়ে আছেন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দিকে, আদৌ কি এই গরিব কৃষক পরিবারটি তাদের শেষ সম্বলটুকু ফিরে পাবে? নাকি রাজনৈতিক টানাপোড়েনে সত্য চাপা পড়ে যাবে? এই উত্তর সময়ের গর্ভেই লুকিয়ে রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির জন্য এক অস্বস্তিকর অধ্যায়।








