তৃণমূলের অন্দরের দ্বন্দ্ব তুঙ্গে, অতিরিক্ত নথি চাইল নির্বাচন কমিশন

তৃণমূল কংগ্রেসের দুই গোষ্ঠীর মধ্যে চলা তীব্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এবার নড়েচড়ে বসল ভারতের নির্বাচন কমিশন। দলের প্রতীক এবং অধিকার সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিবাদ মেটাতে সোমবার নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের বিবদমান দুই পক্ষ। এদিন কমিশন দুই শিবিরের বক্তব্য বিস্তারিতভাবে শোনার পর বিদ্রোহী শিবিরের কাছে আরও বেশ কিছু নথিপত্র এবং তথ্যাদি তলব করেছে। নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

উল্লেখ্য যে, পশ্চিমবঙ্গে এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে রাজ্যের শাসনক্ষমতায় রয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি। অন্যদিকে, রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বর্তমানে বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে রয়েছেন। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকারের জমানায় তৃণমূলের এই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব রাজ্যের রাজনীতির অন্যতম আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দলের অভ্যন্তরীণ এই ভাঙন ঠেকাতে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব একাধিকবার তৎপর হলেও, সেই চেষ্টা যে পুরোপুরি সফল হয়নি তা কমিশনের দরজায় দুই গোষ্ঠীর উপস্থিতিতেই পরিষ্কার হয়ে গেল।

সূত্র থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সামনে তৃণমূলের বর্তমান নেতৃত্ব এবং বিদ্রোহী শিবিরের প্রতিনিধিরা তাদের স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। দলের গঠনতন্ত্র, কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যপদের বৈধতা এবং দলীয় প্রতীকের দাবি নিয়ে উভয় পক্ষই এদিন দীর্ঘ সওয়াল-জবাব করেছে। কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কেবল মৌখিক যুক্তিতে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। বিদ্রোহী শিবিরের পক্ষ থেকে যে দাবি তোলা হয়েছে, তা প্রমাণ করার জন্য তাদের কাছে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই নথি জমা দেওয়ার সময়সীমা ধার্য করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

রাজনৈতিক মহলের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ এই অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলছে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের শক্তিতে। একদিকে যখন রাজ্যের বর্তমান শাসক দল বিজেপি নিজেদের সংগঠন মজবুত করার দিকে নজর দিচ্ছে, ঠিক তখনই প্রধান বিরোধী দলের এই প্রতীক সংক্রান্ত আইনি জটিলতা জনমানসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন এবং সাম্প্রতিক একাধিক সাংগঠনিক ব্যর্থতার পর দলের অন্দরে বিদ্রোহ নতুন মাত্রা পেয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামী বনাম বিদ্রোহীদের এই লড়াইতে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন কী রায় দেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল।

নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতার সাথে তারা পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আবেগ নয়, বরং দলের সংবিধান এবং নির্বাচন কমিশনের নিয়ম মেনেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যদি প্রয়োজনীয় নথিপত্র সময়মতো জমা না পড়ে, তবে কমিশন আইনি বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। বিদ্রোহী শিবিরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা শীঘ্রই কমিশনের তলব করা সমস্ত নথিপত্র জোগাড় করে জমা দেবেন। তবে এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় দলের সাংগঠনিক কার্যকলাপে যে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে তৃণমূলের সাধারণ কর্মীরা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন।

তৃণমূলের অন্দরের এই দ্বন্দ্ব কেবল প্রতীক দখলের লড়াই নয়, বরং ক্ষমতার অলিন্দে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার এক মরিয়া চেষ্টা। এই লড়াইতে শেষ পর্যন্ত কার জয় হয় এবং কমিশনের রায় কোন দিকে যায়, তা নিয়ে এখন সরগরম রাজ্য-রাজনীতি। এদিকে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার তথা মুখ্যমন্ত্রীর দফতর এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে বিরোধী দল হিসেবে তৃণমূলের এই অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে রাজ্যের রাজনৈতিক ময়দানে বিজেপি যে আরও কোণঠাসা করার চেষ্টা করবে, তা বলাই বাহুল্য। বিস্তারিত তথ্যের জন্য কমিশনের পরবর্তী শুনানির দিকেই তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।