পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার শালবনি ব্লকে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর জমি দুর্নীতি মামলায় তদন্তের গতি এবং পরিধি ক্রমশ বৃদ্ধি করছে রাজ্য পুলিশের অপরাধ দমন শাখা বা সিআইডি। সাম্প্রতিক তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে যে, এই গভীর ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার অভিযোগে তদন্তকারী আধিকারিকরা আরও তিন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছেন। এই গ্রেপ্তারের ফলে দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকা এই জমি কেলেঙ্কারির তদন্তে এক নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ হয়েছে বলে মনে করছেন প্রশাসনিক মহলের একাংশ।
তদন্তকারী সংস্থার দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের দীর্ঘ ও কঠোর জিজ্ঞাসাবাদের পর এবং কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র হস্তগত করার পরেই তাদের গ্রেপ্তার করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাজ্যজুড়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বা বিন্দুমাত্র ছাড় না দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে বর্তমান সুভেন্দু অধিকারী নেতৃত্বাধীন সরকার। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সুভেন্দু অধিকারী বারবারই দুর্নীতিমুক্ত স্বচ্ছ প্রশাসনের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। সেই প্রেক্ষিতেই এই ধরনের বড় মাপের আর্থিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতিতে সিআইডির নজিরবিহীন সক্রিয়তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে এই ধরনের কেলেঙ্কারির অসংখ্য অভিযোগ স্থানীয় পর্যায়ে উঠলেও, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে সামগ্রিক তদন্ত প্রক্রিয়াকে অনেকটাই ত্বরান্বিত করা হয়েছে। শাসক দল বিজেপি এই বিষয়ে শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে এবং স্বাভাবিকভাবেই বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরেও এই আকস্মিক গ্রেপ্তারির প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক চর্চা ও শোরগোল তুঙ্গে উঠেছে।
শালবনি অঞ্চলের এই জমি দুর্নীতি মামলায় প্রধানত জমির দলিল জাল করা এবং সরকারি সম্পত্তি বেআইনিভাবে প্রভাবশালীদের কাছে হস্তান্তরের অভিযোগ উঠেছিল বেশ কিছুদিন আগেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, অত্যন্ত প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ মদতেই এই বিশাল জালিয়াতি পরিকল্পিতভাবে সংগঠিত হয়েছে। ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের কিছু স্তরের কর্মকর্তাদের গভীর যোগসাজশ থাকার সম্ভাবনাও গোয়েন্দারা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। ধৃতদের আজ জেলা আদালতে তোলা হবে এবং সিআইডি তাদের নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার জন্য আবেদন জানাবে। হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমেই এই পুরো চক্রের আসল মাথা বা মূল হোতা এবং এর সঙ্গে পর্দার আড়ালে আর কারা যুক্ত রয়েছেন, সেই নামগুলি সামনে আনতে চাইছেন তদন্তকারীরা।
উল্লেখ্য, বর্তমান শাসক দল বিজেপির পক্ষ থেকে এই তদন্তকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ বলে দাবি করা হয়েছে। তাদের মতে, দোষীরা শাস্তি পাবে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই এই গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের দলের নেতাদের ফাঁসানো হচ্ছে। যদিও রাজ্য প্রশাসনের কঠোর দাবি, আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে এবং যে বা যারা সরকারি জমি বেদখল বা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত, তারা কেউই ভবিষ্যতে রেহাই পাবেন না।
শালবনি জমি দুর্নীতি মামলায় ধৃতদের সঠিক পরিচয় এবং তাদের নির্দিষ্ট দায়ভার নিয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও পর্যন্ত সিআইডির তরফে সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি। গোয়েন্দা সূত্রের খবর, তদন্তের স্বার্থে এবং চক্রের বাকি সদস্যদের সতর্ক না করতে এখনই নাম প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আমরা ক্রমাগত এই ঘটনার ওপর নজর রাখছি এবং পরবর্তী প্রতিটি পদক্ষেপের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই ঘটনা নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও উত্তেজনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জমি মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য রুখতে রাজ্য সরকারের এই কড়া মনোভাব কতটা কার্যকর হয়, তা সময়ই বলবে। তবে এই তিনটি গ্রেপ্তারের পর গোটা জেলায় জমি সংক্রান্ত দলিলাদির রেকর্ড খুঁটিয়ে দেখার কাজ শুরু হয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আভাস দেওয়া হয়েছে। ধৃতদের জেরা করে ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো চক্রের হদিস মেলে কি না, এখন সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের আশঙ্কা, যেভাবে তাদের জমি হাতানোর চেষ্টা করা হয়েছে, তাতে করে আগামী দিনে আরও বড় সত্য উন্মোচিত হতে পারে। প্রশাসন জানিয়েছে, তারা সাধারণ মানুষের স্বার্থে জমির নথিপত্র ডিজিটালাইজেশন করার প্রক্রিয়ায় বিশেষ নজর দেবে যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো জালিয়াতি না হয়।








