কলকাতার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সাম্প্রতিক মন্তব্য এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাজ্যের শাসনক্ষমতা পরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি রাজ্যের সাধু-সন্ত এবং অগুনতি ধর্মপ্রাণ মানুষের উদ্দেশ্যে এক বিশেষ বার্তা প্রদান করেছেন। একটি জনসভায় মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, রাজ্যে এখন পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে এবং সনাতন ধর্মের ধারক ও বাহকরা এখন নির্ভয়ে গীতা পাঠ করতে পারেন। আগের জমানায় অর্থাৎ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ শাসনকালে যে ভীতি বা নিষেধাজ্ঞার পরিবেশ ছিল বলে অভিযোগ ওঠে, শুভেন্দু অধিকারীর দাবি অনুযায়ী সেই দমবন্ধ পরিস্থিতি বর্তমানে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত।
শুভেন্দু অধিকারী এদিন সাধুদের এক বিশাল জমায়েতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “রাজ্যের সামগ্রিক আবহাওয়া বদলে গেছে। এখন আর কাউকে গীতা পাঠের জন্য কোনো সরকারি দপ্তরের অনুমতি নিতে হবে না বা অন্ধকারে লুকিয়ে পুজো-অর্চনা করতে হবে না। বর্তমান সরকার ধর্মীয় ভাবাবেগকে সম্মান জানাতে সর্বতোভাবে বদ্ধপরিকর। হিন্দু সনাতন ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার বাধা বা প্রতিবন্ধকতা সরকার বরদাস্ত করবে না।” তার এই বক্তব্য উপস্থিত সাধু-সন্তদের মধ্যে এক নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে।
তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধী দল হিসেবে বর্তমানে ব্যাকফুটে থাকলেও, বিজেপির এই জমানায় ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, বিগত দিনে রাজ্যে যেভাবে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি দেখা গিয়েছিল এবং একটি বিশেষ শ্রেণিকে তুষ্ট করার জন্য অন্য ধর্মকে উপেক্ষা করা হয়েছিল, বর্তমান সরকার সেই গ্লানিময় ধারা থেকে বেরিয়ে এসে সর্বজনীন উন্নয়নের পাশাপাশি সংস্কৃতির প্রসারেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি স্পষ্ট জানান যে, যে সমস্ত সাধু-সন্তরা আগে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন বা প্রশাসনিক ভয়ে কোণঠাসা হয়ে জীবনযাপন করছিলেন, তাদের অধিকার এখন সম্পূর্ণ সুরক্ষিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর এই বার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে যখন বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বিজেপির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার কাল্পনিক অভিযোগ তোলা হয়, তখন সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর মুখ থেকে এই ধরনের দৃঢ় আশ্বাস সেই অভিযোগকে খণ্ডন করারই একটি কৌশল। শুভেন্দু অধিকারী এদিন আরও বলেন যে, ভারতের হাজার বছরের সনাতন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার লড়াইয়ে বিজেপি বরাবরই সাধু-সমাজের পাশে দাঁড়িয়েছে। রাজ্যে এখন যে শান্তি ও শৃঙ্খলার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তাতে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে তোষণ করার চেয়ে সবার সমানাধিকারকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতাই এখন রাজ্যের আসল শক্তি।
উল্লেখ্য যে, দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগ উঠেছিল পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে। দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্মীয় শোভাযাত্রা—সবক্ষেত্রেই পুলিশি নিয়ন্ত্রণের বেড়াজাল নিয়ে ক্ষোভ ছিল সাধারণ মানুষের মনে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সেই পরিস্থিতি আমূল বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এবার কার্যত তার বাস্তবায়ন ঘটিয়ে তিনি বার্তা দিলেন, সাধুরা নির্ভয়ে তাঁদের ধর্মীয় কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। প্রশাসনের তরফেও কোনো অযাচিত হস্তক্ষেপ হবে না বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
রাজ্যের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় ধর্মীয় স্বাধীনতা যে এক পরম সত্য, তা আরও একবার প্রতিষ্ঠা করতেই মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এই ঘোষণার পর বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন মুখ্যমন্ত্রীর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। রাজ্যজুড়ে এখন গীতা পাঠ ও ধর্মীয় প্রচার নিয়ে যে নতুন উৎসাহ দেখা যাচ্ছে, তা বর্তমান সরকারের এই কৌশলেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে মনে করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক স্বস্তির হাওয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে, কারণ এখন তারা মনে করছেন, নিজের ধর্ম পালন করতে গেলে কোনো প্রশাসনিক ভয়ের প্রয়োজন নেই। মুখ্যমন্ত্রী তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বার্তা দিলেন যে, পশ্চিমবঙ্গ এখন এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে মর্যাদার সঙ্গে পালন করতে সক্ষম। এই পরিবর্তন কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এটি একটি সামাজিক নবজাগরণের ইঙ্গিতবাহী।








