রূপপুর প্রকল্পের ইউরেনিয়াম পরিবহনে পাক বাধার মুখে বাংলাদেশ

পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জ্বালানি পরিবহন নিয়ে বড় ধরনের কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়ামের চালান নিয়ে যাওয়ার সময় পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি মেলেনি বলে খবর পাওয়া গেছে। পাকিস্তানের তরফে এই সিদ্ধান্তকে একটি ‘কারিগরি সমস্যা’ বলে অভিহিত করা হলেও, আন্তর্জাতিক মহলে এই ঘটনা নিয়ে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জ্বালানি পরিবহনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এমন বাধা অপ্রত্যাশিত এবং এর পেছনে গভীর কোনো কৌশলগত কারণ থাকতে পারে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পারমাণবিক জ্বালানি রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসার পথে পাকিস্তানের আকাশসীমা অতিক্রম করার কথা ছিল। তবে ইসলামাবাদ শেষ মুহূর্তে এই অনুমতি দিতে অস্বীকার করায় মাঝপথেই আটকে গিয়েছে এই গুরুত্বপূর্ণ চালান। পাকিস্তান প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কারিগরি ত্রুটির কারণেই এই অনুমতি দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে বাংলাদেশের পারমাণবিক প্রকল্পের নিরাপত্তা ও সময়সীমা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই ঘটনা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

উল্লেখ্য যে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের ওপর দেশটির বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি অনেকাংশে নির্ভর করছে। রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত এই প্রকল্পে ইউরেনিয়ামের সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা অত্যন্ত জরুরি। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের সুযোগ না মেলায় নতুন করে রুট নির্ধারণ বা বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, যা প্রকল্পটিকে সাময়িকভাবে কিছুটা হলেও বিলম্বিত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা ও প্রোটোকল মেনে চলতে হয়। সাধারণত আকাশসীমা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো যথাযথ অনুমতি প্রদান করে থাকে। পাকিস্তান কেন শেষ মুহূর্তে পিছু হঠল এবং কারিগরি কারণটি ঠিক কী, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পাকিস্তান তার অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে কলকাতা বরাবরই সংযত থাকে, তবে দক্ষিণ এশীয় নিরাপত্তা কাঠামোর স্বার্থে এই ধরনের ঘটনায় উদ্বেগের সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। আমাদের রাজ্যের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালের ভিন্ন ভিন্ন কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা অনেকেই মনে করিয়ে দিচ্ছেন। রাজ্যে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এবং বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারাও আন্তর্জাতিক এই ঘটনাপ্রবাহের দিকে নজর রাখছেন।

পরিশেষে বলা যায়, জ্বালানি নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে এমন রাজনৈতিক বা কারিগরি বাধা গোটা দক্ষিণ এশিয়ার অস্থিতিশীল পরিস্থিতিরই ইঙ্গিত দেয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মতো মেগা প্রজেক্টের ক্ষেত্রে এই ধরনের বিলম্বের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার এই সংকট মোকাবিলায় কূটনৈতিক চ্যানেলে কীভাবে অগ্রসর হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়। পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্তের ফলে নতুন কোনো ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয় কি না, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো।