বুদ্ধিজীবীদের ‘বৃহন্নলা’ বলে কটাক্ষ কার্তিক মহারাজের, তুঙ্গে বিতর্ক

রাজ্যের প্রবীণ সন্ন্যাসী কার্তিক মহারাজের এক বিতর্কিত মন্তব্য ঘিরে এখন উত্তাল পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল। সম্প্রতি এক প্রকাশ্য সভায় রাজ্যের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের একাংশকে উদ্দেশ্য করে তিনি যে ভাষায় ‘বৃহন্নলা’ শব্দপ্রয়োগ করেছেন, তা নিয়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে সর্বত্র। বিশেষ করে, পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক পরিসরে এই মন্তব্যকে অত্যন্ত অসম্মানজনক এবং অশালীন বলে অভিহিত করছেন বিদ্বজ্জনরা। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে প্রতিবাদের সুর চড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, সাম্প্রতিক একটি ঘরোয়া বা বিশেষ সভায় কার্তিক মহারাজ বুদ্ধিজীবীদের বর্তমান ভূমিকা ও তাঁদের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে গিয়ে এই কঠোর শব্দচয়ন করেছেন। তাঁর দাবি, রাজ্যের সংকটকালীন মুহূর্তে বা যখন সমাজকে পথ দেখানোর প্রয়োজন, তখন বুদ্ধিজীবীরা ‘বৃহন্নলা’র মতো আচরণ করছেন। তাঁর এই মন্তব্যের ভিডিয়ো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পরেই রাজ্যজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। বিভিন্ন অরাজনৈতিক সংগঠন এবং সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা এই ধরনের মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের মতে, সন্ন্যাসী হিসেবে এই ধরনের ভাষা প্রয়োগ প্রত্যাশিত নয়।

উল্লেখ্য, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে। অন্যদিকে, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস বর্তমানে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে কাজ করছে। এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই বিরোধী শিবির থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্ররা সরব হয়েছেন। তাঁরা অভিযোগ করেছেন, বর্তমান শাসনব্যবস্থার মদতেই এই ধরণের মানুষরা বুদ্ধিজীবীদের অপমান করার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন। বিরোধীদের দাবি, রাজ্যের বুদ্ধিজীবীরা সবসময়ই মেরুদণ্ড সোজা রেখে কথা বলেছেন এবং ভবিষ্যতেও বলবেন। কার্তিক মহারাজের এই মন্তব্যের মাধ্যমে আসলে বিদ্বজ্জনদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চলছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

অন্যদিকে, বিজেপি বা শাসকদলের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণে এই ঘটনা এক নতুন মাত্রা যোগ করল। বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা নিয়ে আগেও অনেক বিতর্ক হয়েছে, তবে একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের এই ধরণের মন্তব্য সেই বিতর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল। বুদ্ধিজীবী মহলের একাংশ জানিয়েছে, তারা এই ধরণের ব্যক্তিগত আক্রমণকে গুরুত্ব দিতে রাজি নন, তবে এই ধরণের ভাষাগত অবক্ষয় যে সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়, তা স্পষ্ট।

উল্লেখ্য, কার্তিক মহারাজ এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে কোনো ব্যাখ্যা বা দুঃখপ্রকাশ করেছেন কি না, সেই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এই মুহূর্তে আমাদের কাছে নেই। এই ঘটনার জেরে আগামিদিনে কলকাতার রাজপথে কোনো বড় ধরনের বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে কি না, তা নিয়েও জল্পনা চলছে। রাজ্যের বিশিষ্ট নাগরিকরা মনে করছেন, সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমালোচনা এবং মতবিরোধ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অশালীন শব্দচয়নের পর্যায়ে না পৌঁছায়।

পুরো বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ইন্টারনেটে এই ঘটনা নিয়ে নানা ধরনের মিম এবং বিতর্কিত আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, ধর্মীয় পোশাকের আড়ালে রাজনৈতিক আক্রমণ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। আবার অনেকের মতে, বুদ্ধিজীবীদেরও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন আছে। সব মিলিয়ে কার্তিক মহারাজের এই বিতর্কিত মন্তব্য পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক জটিল আয়না হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।