ইরাকে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে চলা মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল। এই সিদ্ধান্তের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা সূত্রে খবর, ইরাকের ক্যাম্প ভিক্টরি থেকে মার্কিন বিমান বাহিনীর সি-১৩০ হারকিউলিস সামরিক পরিবহন বিমান শেষবারের মতো উড্ডয়নের প্রস্তুতি নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই দীর্ঘস্থায়ী অভিযানের ইতি টানা হয়। বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইরাকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ দমনের লক্ষ্যে যে যৌথ সামরিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল, তা এখন থেকে নতুন রূপ নিল।
দীর্ঘদিনের এই যুদ্ধের ফলে ইরাকের জনজীবন এবং অবকাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব পড়েছে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে বিদেশি শক্তির সরাসরি উপস্থিতির প্রয়োজন কমেছে। তবে এই প্রত্যাহার প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, মার্কিন বাহিনীর এই সরে আসা ইরাকের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামোকে এক অনিশ্চিত পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে আইসিস-সহ বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর পুনরায় সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ইরাকের রাজধানী বাগদাদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি থেকে জোটের সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ক্যাম্প ভিক্টরির মতো কৌশলগত ঘাঁটিগুলো এখন থেকে পুরোপুরি ইরাকি প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। ১২ বছরের এই দীর্ঘ সফরে বহু প্রাণহানি এবং আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে দেশটিকে। এখন ইরাকি সরকার এবং সেনাবাহিনী নিজ দেশের সুরক্ষার দায়িত্ব এককভাবে কতটা সফলভাবে পালন করতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
উল্লেখ্য, ২০০৩ সালের প্রেক্ষাপট এবং পরবর্তী সময়ে ইরাকে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার প্রেক্ষিতে এই জোটের গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে ১২ বছর পর মার্কিন প্রশাসনের এই নীতিগত পরিবর্তন স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, ওয়াশিংটন এখন নিজেদের সামরিক ব্যয় সংকোচন এবং আঞ্চলিক কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনতে চাইছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ এখন পুরোপুরি ইরাকি নেতৃত্বের কাঁধে।
এদিকে, ক্যাম্প ভিক্টরি থেকে সামরিক সরঞ্জাম এবং সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনকে সামরিক প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। তবে এই সহায়তার পরিমাণ বা প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। ইরাকি জনগণের একাংশ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও, বহু মানুষ বিদেশি বাহিনীর উপস্থিতিকে নিরাপত্তার গ্যারান্টি হিসেবে দেখত। তাদের মনে দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তার কালো মেঘ এখনও অমলিন।
এই ঐতিহাসিক প্রত্যাহারের ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে, যে উদ্দেশ্যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী ইরাকে প্রবেশ করেছিল, তা কতটা অর্জিত হয়েছে, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। কূটনৈতিক মহল মনে করছে, এটি শুধুমাত্র একটি সামরিক প্রত্যাহার নয়, বরং এটি আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য নীতির এক বৃহত্তর পরিবর্তনের সূচক। আগামী দিনগুলোতে ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্কের সমীকরণ কীভাবে বদলায়, তা এখন বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই আন্তর্জাতিক সংবাদের প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য। রাজ্যে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার এবং বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যেকার টানাপোড়েনের মাঝেও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে। যদিও এই ঘটনার সঙ্গে রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কোনো সরাসরি যোগ নেই, তবুও বিশ্বশান্তি এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বরাবরই সচেতন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমল থেকে শুরু করে বর্তমান শাসনকাল পর্যন্ত, এই ধরনের আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যে পড়ে, যার আঁচ পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাতেও অনুভূত হয়।








