কল্যাণীতে প্রস্তাবিত নতুন বিমানবন্দর প্রকল্পকে ঘিরে এখন নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। প্রকল্পের উড়ান পথ বা ফ্লাইট পাথ নির্ধারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে এক গভীর জটিলতা। ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, প্রকল্পের ব্লু-প্রিন্ট এবং প্রস্তাবিত উড়ান পথের বিন্যাস নিয়ে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলির সঙ্গে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আগেই জানিয়েছিলেন যে, রাজ্যকে নতুন শিল্প মানচিত্রে স্থান দিতে পরিকাঠামো উন্নয়নের বিকল্প নেই। সেই লক্ষ্যেই কল্যাণীকে কেন্দ্র করে বিমান পরিবহণ হাব তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসে প্রযুক্তিগত এবং কৌশলগত কিছু বাধা সামনে এসেছে। বিশেষ করে, যে এলাকা দিয়ে উড়ান চলাচলের পথ চিহ্নিত করা হয়েছে, সেই এলাকায় ঘনবসতি এবং বেশ কিছু বহুতল ভবন রয়েছে। এই ভবনগুলির উচ্চতা বিমান চলাচলের নিরাপত্তা বিধি মেনে কতখানি সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে চূড়ান্ত রিপোর্ট এখনও পাওয়া যায়নি।
বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বর্তমান সরকারের সমালোচনা শুরু করেছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিকবার রাজ্যের শিল্পায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, অপরিকল্পিতভাবে প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির শিকার হতে হবে। তবে রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি বিষয়টিকে ‘প্রশাসনিক প্রক্রিয়া’ হিসেবেই দেখছে। বিজেপি নেতাদের দাবি, এই ধরনের বড় প্রকল্পে প্রযুক্তিগত সমীক্ষা এবং আইনি ছাড়পত্র পেতে সময়ের প্রয়োজন হয়। উড়ান পথ সংক্রান্ত এই জটিলতা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব।
বিমানবন্দর উন্নয়ন সংক্রান্ত নথিপত্রে দেখা গিয়েছে, উড়ান পথের অভিমুখ যদি পরিবর্তন করতে হয়, তবে তা কেবল কারিগরি দিক থেকেই নয়, বরং আর্থিক দিক থেকেও প্রকল্পটিকে ব্যয়বহুল করে তুলবে। প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ এবং আশেপাশের অবকাঠামো সাজাতে এমনিতেই বিশাল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে। তার ওপর যদি উড়ান পথ পুনর্বিন্যাস করতে হয়, তবে প্রকল্প শেষ হওয়ার সময়সীমা আরও পিছিয়ে যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া বা এএআই-এর গাইডলাইন মেনেই সব কাজ হচ্ছে। কিন্তু ঠিক কোন বিন্দুতে মতের অমিল হয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য আপাতত সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশও এই অনিশ্চয়তায় উদ্বিগ্ন। তারা জানতে চাইছেন, বিমানবন্দরের জন্য চিহ্নিত এলাকায় তাদের বসতবাড়ি বা জমি অধিগ্রহণ করা হবে কি না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট আশ্বাস না পাওয়ায় এলাকায় জল্পনা বাড়ছে। নগরোন্নয়ন বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, বিমানবন্দর তৈরির আগে উড়ান পথের করিডোর নিশ্চিত করা প্রাথমিক শর্ত হওয়া উচিত ছিল। সেটি না হওয়ায় এখন প্রকল্পটিকে পুনরায় খতিয়ে দেখতে হতে পারে।
ইতিমধ্যে, এই প্রকল্প নিয়ে কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের সঙ্গে রাজ্যের প্রতিনিধিদলের বৈঠকের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সূত্রের খবর, প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের মূলধনী কাজের গতি কিছুটা মন্থর রাখা হতে পারে। রাজ্যের শিল্পায়ন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার এই স্বপ্নের প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে কেন্দ্রীয় উড়ান সুরক্ষা সংক্রান্ত নিয়ামক সংস্থাগুলির ছাড়পত্রের ওপর। সংশ্লিষ্ট সরকারি মহলের দাবি, নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করে কোনো উড়ান পথ তৈরি করা সম্ভব নয়। ফলে উড়ান পথের এই ‘সংঘর্ষ’ বা জটিলতা নিরসনে দ্রুত কোনো বৈঠক ডাকা হতে পারে। কল্যাণীর সাধারণ মানুষ এখন তাকিয়ে রয়েছে প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। উন্নয়নের স্বার্থে কি নতুন পথ বেছে নেওয়া হবে, নাকি বিদ্যমান পরিকাঠামোয় পরিবর্তন এনে প্রকল্প টিকিয়ে রাখা হবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। বিস্তারিত সরকারি রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত ধোঁয়াশা বজায় থাকছে।








