আন্তঃরাজ্য অস্ত্র কারবারের পর্দাফাঁস এসটিএফের, ধৃত ৪

কলকাতার বুকে আবারও বড়সড় সাফল্য পেলেন রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বা এসটিএফ। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এক বিশেষ অভিযানে আন্তঃরাজ্য অস্ত্র পাচারকারী চক্রের চারজন পাণ্ডাকে গ্রেফতার করেছেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। রবিবার দুপুরে শহরের উপকণ্ঠ থেকে ধৃতদের পাকড়াও করা হয়েছে। গোপন সূত্রে খবর পেয়েই এসটিএফের একটি বিশেষ দল ফাঁদ পেতেছিল। ধৃতদের কাছ থেকে বেশ কিছু অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ কার্তুজ উদ্ধার হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের সঠিক সংখ্যা ও বিস্তারিত তথ্য তদন্তের স্বার্থে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।

গোয়েন্দা সূত্রের খবর, গত বেশ কিছুদিন ধরেই বিহার ও ঝাড়খণ্ডের সীমানা ব্যবহার করে এই চক্রটি নিয়মিতভাবে কলকাতায় অস্ত্র সরবরাহ করছিল। শহরের অপরাধ জগতের একাংশ এই চক্রটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছেন তদন্তকারীরা। ধৃতদের দফায় দফায় জেরা করে এই অস্ত্র চোরাচালান চক্রের মূল মাথাদের পরিচয় পাওয়ার চেষ্টা করছেন গোয়েন্দারা। এই চক্রটি মূলত রাজ্য জুড়ে বড় ধরনের নাশকতামূলক কার্যকলাপ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে অস্ত্র সরবরাহ করত কি না, তা নিয়েও জোর জল্পনা চলছে। পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা জানিয়েছেন, শহরের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে রাজ্য পুলিশ সদাসর্বদা তৎপর। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে পুলিশকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। সেই নির্দেশের পথেই এসটিএফের এই সাফল্য এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। অপরাধ দমনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে বর্তমান প্রশাসন।

উল্লেখ্য, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে বিরোধী পক্ষ বারবার সরব হয়েছে। বর্তমানে রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি সরকার দাবি করছে যে, অপরাধ দমনে পুলিশকে পুরোপুরি স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে পুলিশ বর্তমানে কাজ করছে। তৃণমূল কংগ্রেস বা টিএমসি এই ঘটনায় রাজনৈতিক রং লাগানোর চেষ্টা করলেও পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, অপরাধ দমনে কোনো রাজনৈতিক ভেদাভেদ বরদাস্ত করা হবে না। ধৃতদের আজই আদালতে তোলা হবে এবং তাদের নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাবে পুলিশ। হেফাজতে নিয়ে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এই অস্ত্র চক্রের সাথে যুক্ত আরও অনেক গোপন তথ্যের হদিস পাওয়া সম্ভব হবে বলে আশাবাদী তদন্তকারী দল।

তদন্তকারী এসটিএফের এক আধিকারিক জানান, ধৃতদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। অস্ত্র আইনে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। আন্তঃরাজ্য এই অপরাধী চক্রের জাল কতটা বিস্তৃত, তা খতিয়ে দেখতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের অন্যান্য শাখার সাথেও সমন্বয় রক্ষা করা হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলির পুলিশের সাথেও যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছে যাতে এই চক্রের অন্য সদস্যদেরও দ্রুত গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। শহরের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এই বিষয়ে কোনো রকম গাফিলতি সহ্য করা হবে না বলে প্রশাসনের তরফ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে।

ধৃতদের কাছ থেকে পাওয়া মোবাইল ফোন এবং নথিগুলো খতিয়ে দেখছেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। তাদের কাছ থেকে পাওয়া কল রেকর্ড ও মেসেজ ঘেঁটে দেখা হচ্ছে তারা আর কার কার সাথে যোগাযোগ রেখেছিল। শহরকে আগ্নেয়াস্ত্র মুক্ত রাখার লক্ষ্যে এই ধরনের অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলে এসটিএফ সূত্রে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তদন্তের খাতিরে আপাতত ধৃতদের নাম প্রকাশ্যে আনা হয়নি। গোটা ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় মানুষ পুলিশের এই দ্রুত পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। অস্ত্র চোরাচালানের মতো গুরুতর অপরাধের সাথে যারা যুক্ত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন সাধারণ মানুষ।

রাজ্য পুলিশের এই অভিযানে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা বোধ বৃদ্ধি পেয়েছে। অস্ত্র ব্যবসায়ীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে এসটিএফের এই সাফল্য মাইলফলক হয়ে থাকবে। গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা দিনরাত পরিশ্রম করে এই চক্রের সন্ধানে নেমেছিলেন। এখন দেখার বিষয়, ধৃতদের জেরা করে আর কত বড় অপরাধী জগতের পর্দা ফাঁস করতে পারে পুলিশ। তদন্ত কতদূর অগ্রসর হয়, সেদিকেই এখন নজর সকলের। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ যে অপরাধীদের কোনোভাবেই ছাড় দিচ্ছে না, এই অভিযান তারই একটি বড় প্রমাণ। সাধারণ নাগরিক হিসেবে সবাই চাইছেন, শহরের বুকে এই ধরনের বেআইনি অস্ত্রের প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ হোক এবং সমাজবিরোধী চক্রগুলি নির্মূল হোক।