আসন্ন দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে জনসংযোগে জোর দিতে চলেছে শাসকদল বিজেপি। দলীয় সূত্রে খবর, দুর্গাপূজার দিনগুলিতে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের পূজা মণ্ডপগুলিকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫০০০টি বইয়ের স্টল খোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মূলত যুব সমাজ এবং সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করাই এই অভিনব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, উৎসবের আমেজকে কাজে লাগিয়ে আদর্শগত প্রচার এবং দলের কর্মসূচি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এটি একটি সুপরিকল্পিত কৌশল।
বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব এই কর্মসূচিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন। জানা গিয়েছে, প্রতিটি স্টলে এমন সব বই রাখা হবে যা দলের আদর্শ, ইতিহাস এবং বর্তমান রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আলোকপাত করবে। এই বিষয়ে দলের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, পূজা মানেই বাঙালির প্রাণের উৎসব, আর এই উৎসবের দিনে মানুষ আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার পাশাপাশি নতুন কিছু জানতেও আগ্রহী হয়। সেই আগ্রহকেই পাথেয় করে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। বিশেষ করে শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই যেন তরুণ প্রজন্মের কাছে দলের বার্তা পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে জেলা স্তরে বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দলের এই কর্মসূচিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। প্রশাসনিক ও দলীয় স্তরে ভারসাম্য বজায় রেখে তিনি মনে করছেন, এই ধরনের উদ্যোগের ফলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে দলের যে দূরত্ব ছিল তা অনেকাংশে ঘুচবে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে স্বচ্ছ ও গঠনমূলক প্রচারের ওপর জোর দিচ্ছে বিজেপি। রাজ্যের বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস এই কর্মসূচিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে কটাক্ষ করলেও বিজেপি নেতৃত্ব তা মানতে নারাজ। তাদের দাবি, বই পড়া একটি সুস্থ সংস্কৃতি, আর সেই সংস্কৃতির মাধ্যমেই সমাজ পরিবর্তনের বার্তা দেওয়া হবে।
রাজ্য বিজেপি সূত্রে আরও জানা গেছে, পুজোর আগে থেকেই এই স্টলগুলি সাজিয়ে তোলার কাজ শুরু হবে। প্রতিটি স্টলে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক থাকবেন, যারা আগত দর্শকদের সঙ্গে কথা বলবেন এবং দলের নীতি ও আদর্শ সম্পর্কে তাদের প্রশ্নের উত্তর দেবেন। ডিজিটাল প্রচারের পাশাপাশি সরাসরি এই ধরনের আলোচনার মাধ্যমে ভোটারদের মন জয় করাই এখন মূল লক্ষ্য। কলকাতা সহ রাজ্যের প্রতিটি বড় মণ্ডপের আশেপাশেই এই স্টলগুলো দেখা যাবে। সংগঠনের ভিত মজবুত করতে এবং আগামী দিনের নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে এবারের দুর্গাপূজায় বিজেপি কার্যত ‘বইয়ের প্রচার’ মডেলকেই হাতিয়ার করছে।
প্রসঙ্গত, অতীতেও বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক দলগুলো উৎসবে জনসংযোগের বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করেছে। তবে ৫০০০টি বইয়ের স্টল বসানোর মতো বৃহৎ পরিকল্পনা এই প্রথম। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় বিজেপি কর্মীদের মধ্যে উৎসাহ তুঙ্গে। মণ্ডপের নিরাপত্তার দিকে নজর রেখে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই এই স্টলগুলি পরিচালনা করা হবে বলে জানানো হয়েছে। পুজোর কয়েকটা দিন বইয়ের স্টলের ভিড়ে মানুষের মনে জায়গা করে নিতে গেরুয়া শিবির যে কোনো খামতি রাখতে চাইছে না, তা এই কর্মসূচির রূপরেখা থেকেই স্পষ্ট।
রাজনীতির আঙিনায় বইয়ের স্টল নতুন নয়, কিন্তু আসন্ন উৎসবের মরসুমে বিজেপির এই কর্মসূচি কতটা প্রভাব ফেলে, তা দেখার অপেক্ষায় রাজনৈতিক মহল। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষজন এই উদ্যোগকে কীভাবে গ্রহণ করবেন, তা সময় বলবে। তবে এটা স্পষ্ট যে, উৎসবের আবহেও রাজনৈতিক প্রচারের ময়দানে কোনো পক্ষই যে ছাড় দিতে রাজি নয়, তার বড় প্রমাণ বিজেপির এই পদক্ষেপ। সব মিলিয়ে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক উত্তাপ যে বইয়ের পাতার আড়ালে আরও বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।







