কলকাতা: আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগে বিজেপির বিধায়কের প্রাক্তন আপ্ত সহায়ক গ্রেফতার, চাঞ্চল্য রাজনৈতিক মহলে
কলকাতা শহর এবং পার্শ্ববর্তী জেলাগুলিতে সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে, যা রাজনৈতিক আঙিনায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিধায়ক পাপিয়া অধিকারীর প্রাক্তন আপ্ত সহায়কের গ্রেফতারির ঘটনায় রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। ধৃত ব্যক্তির নাম সায়ন্তন সান্যাল। লক্ষ লক্ষ টাকা জালিয়াতির অভিযোগে বর্ধমান থানার পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছে। ধৃত সায়ন্তন উত্তর ২৪ পরগনা জেলার জগদ্দল এলাকার বাসিন্দা বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে। সোমবার গভীর রাতে কিংবা ভোরে নিজের বাড়ি থেকেই পুলিশ তাকে আটক করে নিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
সোমবার দুপুরে বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী নিজেই সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে এই গ্রেফতারির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, সায়ন্তন সান্যাল অতীতে তার আপ্ত সহায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করত। তবে তার বিরুদ্ধে গুরুতর আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ আসার পর বিধায়ক তাকে কাজ থেকে অব্যাহতি দেন। পাপিয়া অধিকারী বলেন, “আমি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে তাকে নিজের সহকর্মী হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, সে সেই বিশ্বাসের চরম অবমাননা করেছে।” তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, একজন সহকর্মীর কাছ থেকে এই ধরনের প্রতারণা এবং বিশ্বাসঘাতকতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিধায়কের এই মন্তব্যের পরেই জল্পনা শুরু হয়েছে যে, ঠিক কী পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছে সায়ন্তন এবং কাদের সঙ্গে এই জালিয়াতি করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃত সায়ন্তনের বিরুদ্ধে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট এবং গুরুতর অভিযোগ জমা পড়েছিল। ভুক্তভোগীদের দাবি অনুযায়ী, মোটা অংকের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে অথবা সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে সে বিভিন্ন ব্যক্তির থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে বর্ধমান থানার পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। প্রতারণার মাত্রা এতটাই ব্যাপক যে, এই ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় এলাকায় জোর চর্চা শুরু হয়েছে। একদিকে যখন বিধায়ক তাকে নিজের দপ্তর থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলছেন, অন্যদিকে ধৃত সায়ন্তন সান্যাল পুলিশের কাছে এবং সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বলে দাবি করেছে। সায়ন্তনের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে অথবা কোনো ষড়যন্ত্রমূলক প্রক্রিয়ায় তাকে এই মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। সে দৃঢ়ভাবে দাবি করেছে যে, কোনো ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি বা জালিয়াতির সঙ্গে তার দূরতম সম্পর্কও নেই।
বর্তমানে এই ঘটনাটির তদন্ত ভার সম্পূর্ণভাবে পুলিশের হাতে রয়েছে। বর্ধমান থানার পুলিশ পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখছে। আর্থিক জালিয়াতির প্রকৃত পরিমাণ কত, তা নিয়ে বিশদ অনুসন্ধানের কাজ চলছে। পাশাপাশি, অভিযুক্তের দাবি এবং বিধায়কের অভিযোগ—উভয় দিকই তদন্তকারী আধিকারিকরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। তদন্তের প্রধান প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিধায়কের অফিসের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড কি এই প্রতারণার সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত, নাকি এটি সম্পূর্ণ সায়ন্তনের একক কারসাজি? বিধায়কের বিশ্বাসযোগ্যতাকে পুঁজি করে সে এই ধরনের বেআইনি কাজ করেছে কি না, সেই বিষয়টিও নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় তদন্তকারীরা।
এই ঘটনা সামনে আসার পর বিধায়কের দপ্তরে কর্মরত অন্যান্য কর্মীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সায়ন্তনের ঘনিষ্ঠ মহলে বা দপ্তরের ভেতরে অন্য কোনো ব্যক্তি এই প্রতারণা চক্রের সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত কি না, সে বিষয়েও পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এই বিষয়ে আপাতত বিধায়কের দপ্তর পুরোপুরি পুলিশি তদন্তের ওপর আস্থা রাখছে। উল্লেখ্য, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের আপ্ত সহায়কদের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ ওঠায় স্বাভাবিকভাবেই বিরোধী রাজনৈতিক দল অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) তরফে কোনো প্রতিক্রিয়া আসে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল রয়েছে। বিরোধীরা এই ইস্যুকে হাতিয়ার করে বিধায়কের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে কি না, তা নিয়েও জল্পনা চলছে।
বর্তমানে বর্ধমান থানায় ধৃতকে একটানা জেরা করা হচ্ছে। পুলিশি হেফাজতে নিয়ে তার ফোন কল রেকর্ড, ব্যাংকের লেনদেন এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণাদি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তথ্যের জন্য তদন্তকারী দলের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে সকলের নজর রয়েছে। আপাতত, এই প্রতারণা চক্রের শিকড় কতদূর বিস্তৃত এবং সায়ন্তনের সাথে আরও কেউ জড়িত আছে কি না, তা নিয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য এখনো পুলিশের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে স্থানীয় স্তরে গুঞ্জন, এই ঘটনার তদন্তে আরও বেশ কিছু বড় নাম উঠে আসতে পারে। আপাতত বর্ধমান পুলিশের তৎপরতায় গোটা বিষয়টি কোন দিকে মোড় নেয়, তা দেখার অপেক্ষায় শহরবাসী।








