ড্রপআউট রোধ ও সেমিস্টার পদ্ধতিই নতুন উচ্চমাধ্যমিক সভাপতি লক্ষ্য

পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের নতুন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং সামগ্রিক প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন নবাগত প্রধান। রাজ্য শিক্ষা দপ্তরের সাম্প্রতিক নির্দেশনায় উচ্চমাধ্যমিক স্তরে যে নতুন সেমিস্টার পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার সুপরিকল্পিত এবং সুষ্ঠু বাস্তবায়নই এখন কাউন্সিলের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি, স্কুলছুট বা ড্রপআউট ছাত্রছাত্রীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনা এবং তাদের পুনরায় শিক্ষার মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনাই বর্তমান পর্ষদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উঠে এসেছে। এই দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই বর্তমান সংসদ তাদের আগামীর কর্মপন্থা নির্ধারণ করছে।

সংসদ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক বছরে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হওয়ার পর উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তির হার বৃদ্ধি পেলেও, চূড়ান্ত পরীক্ষা পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই বহু মেধাবী পড়ুয়া মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল এবং আর্থিকভাবে অনগ্রসর পরিবারগুলির পড়ুয়াদের মধ্যে এই প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নতুন সভাপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দফার উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই ইস্যুটিতেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। ড্রপআউটের পেছনে বহুমুখী কারণ রয়েছে, যার মধ্যে অর্থনৈতিক অনটন, পারিবারিক সমস্যা এবং পড়াশোনার প্রতি অনীহা অন্যতম। এই সমস্যা মোকাবিলার জন্য কাউন্সিল এবার প্রতিটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, স্থানীয় প্রশাসন এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় রেখে কাজ করার পরিকল্পনা করছে। এছাড়া, ছাত্রছাত্রীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচিও গ্রহণ করা হবে।

নতুন সেমিস্টার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কাউন্সিলের মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের ওপর পরীক্ষার চূড়ান্ত চাপ কমানো এবং সারা বছর তাদের পড়াশোনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত রাখা। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের নতুন নেতৃত্বের দাবি, এই সেমিস্টার পদ্ধতি চালুর ফলে পড়ুয়াদের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, নিয়মিত এবং বিজ্ঞানসম্মত হবে। তবে, এই সম্পূর্ণ নতুন পরিকাঠামো নিয়ে শিক্ষক মহল এবং অভিভাবকবৃন্দের একাংশের মধ্যে যে সংশয় ও অস্পষ্টতা রয়েছে, তা দূর করা এখন সংসদের কাছে একটি বড় প্রশাসনিক কর্তব্য। নতুন সভাপতি আশ্বস্ত করেছেন যে, পাঠ্যক্রম বা কারিকুলামের কোনো জটিলতা থাকলে তা দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে নিরসন করা হবে এবং পড়ুয়াদের স্বার্থে যা যা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, তা অবিলম্বে সম্পন্ন করা হবে।

এছাড়া, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রণয়ন এবং ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে যে দীর্ঘসূত্রতা অতীতে দেখা গিয়েছে, তা কমিয়ে আনার জন্যও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে কাউন্সিলের সামগ্রিক কাজকর্মকে আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ করার পরিকল্পনাও রয়েছে নতুন সভাপতির। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, কেবল নিয়ম পরিবর্তন নয়, বরং শিক্ষা ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামোগত সংস্কারের ওপর ভিত্তি করেই আগামী দিনের কর্মপন্থা স্থির করা হবে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পড়ুয়ারা যাতে নিজেদের রেজাল্ট বা প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত পেতে পারে, সেদিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি সফল করতে শিক্ষা দপ্তর এবং রাজ্য সরকারের নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনার কথা জানিয়েছেন তিনি। ড্রপআউট রোধে সরকার যে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করেছে, সেগুলির সুবিধা যাতে প্রান্তিক পড়ুয়ারা সঠিকভাবে পায়, তা নিশ্চিত করতে সংসদ সর্বতোভাবে সহায়তা করবে। এর জন্য স্কুলস্তরে একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠনের কথাও ভাবা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা কাউন্সিলের এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয় এবং তা কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছেন শিক্ষক মহল থেকে শুরু করে অভিভাবককুল।

শিক্ষাক্ষেত্রে এমন আমূল পরিবর্তনের নেপথ্যে মূল উদ্দেশ্য হলো পশ্চিমবঙ্গকে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কাউন্সিলের পরবর্তী বৈঠকেই সম্ভবত সেমিস্টার পদ্ধতির বিস্তারিত রূপরেখা এবং ড্রপআউট রোধে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। ছাত্রছাত্রীদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি এবং তাদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তুলতেই সংসদ নিরন্তর কাজ করে চলেছে। সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার আগামী দিনগুলো যে এক নতুন পরিবর্তনের পথে এগিয়ে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য। এখন সময়ের অপেক্ষা, কীভাবে এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে কাউন্সিল সাফল্যের মুখ দেখে।