কলকাতার বেহালা এলাকায় ঘটে যাওয়া এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগে ধৃত তিন ব্যক্তিকে ফের প্রকাশ্যে অর্ধনগ্ন অবস্থায় হাঁটানো হল। পুলিশের দাবি, অপরাধের পুনর্নির্মাণ বা ‘ক্রাইম সিন রিকনস্ট্রাকশন’-এর অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শহরজুড়ে তীব্র বিতর্ক দানা বেঁধেছে। মানবাধিকার কর্মী ও সচেতন নাগরিক মহলে পুলিশের এই কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েকদিন আগে বেহালার সরসুনা এলাকায় এক কিশোরকে বন্দুকের মুখে নগ্ন করে ঘোরানোর অভিযোগ উঠেছিল ধৃত এই তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অভিযোগ, এক তেরো বছরের কিশোরীকে চুমু খাওয়ার অপরাধে ওই কিশোরকে চরম অমানবিক শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। প্রকাশ্যে এই ধরণের গণপিটুনির সমতুল্য অপমান ও নিগ্রহের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর পুলিশ তৎপর হয় এবং অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে।
কিন্তু তদন্তের নামে পুলিশ নিজেই যেভাবে ওই তিন অভিযুক্তকে ঘটনাস্থলে অর্ধনগ্ন অবস্থায় হাঁটালো, তা নিয়ে আইনজ্ঞদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন। পুলিশের দাবি, ঠিক কীভাবে অপরাধটি সংঘটিত হয়েছিল তা খতিয়ে দেখার জন্য অভিযুক্তদের নিয়ে সেই পথেই যাওয়া হয়েছিল। অভিযোগ, পুরো ঘটনাটি ভিডিও ক্যামেরাতেও রেকর্ড করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তির আওতায় আনার বদলে পুলিশের এই ধরণের পদক্ষেপকে ‘নজিরবিহীন’ এবং ‘বেআইনি’ বলে অভিহিত করেছেন বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
পুলিশের এই ভূমিকার জেরে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, অপরাধীদের অপরাধের পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে পুলিশ কি নিজেই আইনের সীমা লঙ্ঘন করল? সংবিধান ও ভারতীয় দণ্ডবিধিতে অভিযুক্তদের যে মর্যাদাপূর্ণ আচরণের অধিকার দেওয়া হয়েছে, পুলিশি তদন্তের এই পদ্ধতিতে তা লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে এখন বড় মাপের আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো মহল থেকে দাবি করা হচ্ছে, জনরোষ শান্ত করার জন্য অথবা এক ধরণের বার্তা দেওয়ার জন্য পুলিশ অতি উৎসাহে এই কাজ করেছে, যা পেশাদারিত্বের পরিচয় দেয় না।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ও সঠিক সময়কাল সংক্রান্ত অন্যান্য খুঁটিনাটি তথ্য আপাতত পুলিশের তদন্ত রিপোর্ট এবং পরবর্তী আদালতের শুনানির ওপর নির্ভর করছে। বর্তমানে ধৃতদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করে তদন্ত প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। তবে এই ঘটনার ফলে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে যেমন অপরাধীদের শাস্তির দাবিতে সরব সাধারণ মানুষ, অন্যদিকে পুলিশের এই ধরণের তদন্তের ধরন নিয়েও তারা শঙ্কিত।
উল্লেখ্য, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রশাসনের স্বচ্ছতা বজায় রাখা নিয়ে রাজ্যে যখন ক্রমাগত চর্চা চলছে, ঠিক সেই সময়ে পুলিশের এমন বিতর্কিত ভূমিকা নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) পুলিশের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে। অপরপক্ষে শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) বা প্রশাসনের শীর্ষকর্তাদের পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি কেবলমাত্র একটি অপরাধের তদন্ত নয়, বরং সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আচরণের মানদণ্ড নিয়েও বড়সড় প্রশ্ন চিহ্ন এঁকে দিয়ে গেল। অভিযুক্তদের শাস্তি হওয়া প্রয়োজন, কিন্তু সেই প্রক্রিয়াটি যেন আইনসম্মত ও মর্যাদাপূর্ণ হয়, সেটিই কাম্য। এই বিষয়ে উচ্চতর তদন্ত বা বিভাগীয় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনার দিনক্ষণ এবং অভিযুক্তদের পরিচয় নিয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।








