দিল্লি থেকে বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ মমতার, পালটা জবাব দিল গেরুয়া শিবির

নয়াদিল্লি: জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় শাসক দল বিজেপির বিরুদ্ধে এক অনমনীয় ও তীব্র আক্রমণের সুর চড়ালেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজধানীর বুকে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় যোগ দিয়ে তিনি সরাসরি দেশের বর্তমান নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং গণতন্ত্র রক্ষার দাবিতে সোচ্চার হলেন। মঞ্চে উপস্থিত বামপন্থী দলের প্রবীণ নেতৃবৃন্দ, পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির নেত্রী মেহবুবা মুফতি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের কর্মী, দেশের তরুণ প্রজন্ম এবং সিটিজেন ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস (সিজেপি) বা নাগরিক ন্যায় ও শান্তি কমিশনের প্রতিনিধিদের উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়ে তিনি নিজের জোরালো বক্তব্য শুরু করেন।

নিজের হিন্দি ভাষার সীমাবদ্ধতার কথা বিনয়ের সঙ্গে উল্লেখ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, তিনি অখিলেশ যাদব বা তেজস্বী যাদবের মতো সাবলীলভাবে হিন্দি বলতে পারেন না। তবে এই ভাষাগত সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও, তিনি অত্যন্ত দৃঢ় ও স্পষ্ট ভাষায় বাংলায় সংঘটিত কথিত ‘লুঠ’-এর অভিযোগ তোলেন। তিনি আবেগময় কণ্ঠে বলেন, “বাংলা আজ এক গভীর পরিস্থিতির শিকার। আমরা এই কঠিন লড়াই কোনোভাবেই ছেড়ে দেব না। প্রয়োজনে নিজের জীবন বিসর্জন দেব, তবুও দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এই দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম এক মুহূর্তের জন্যও থামবে না।”

এদিন মমতার মূল নিশানায় ছিল ‘এসআইআর’ (SIR) বা তথাকথিত ‘স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিলিফ’ তত্ত্ব। তাঁর অভিযোগ, শাসক দল অতি সূক্ষ্মভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কারচুপি করেছে। মমতা বলেন, “নির্বাচন কমিশন এবং ইভিএম যন্ত্রের অপব্যবহারের মাধ্যমে এই দেশের গণতন্ত্র ও সংবিধানকে লুঠ করা হয়েছে। এমনকি ভোটার তালিকা থেকে বাংলার প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষের নাম সুপরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। ‘ভ্যানিশ কুমারজি’ শুধু ভোট নয়, গোটা গণনা প্রক্রিয়াকেই যাদু মন্ত্রের মতো উধাও করে দিয়েছেন।” তিনি আরও দৃঢ়ভাবে দাবি করেন যে, তৃণমূল কংগ্রেস নির্বাচনে হারেনি, বরং তাদের অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হারানো হয়েছে।

তৃণমূল নেত্রীর অভিযোগের তালিকা ছিল দীর্ঘ। তিনি বলেন, শুধু নির্বাচন নয়, মন্দির, মসজিদ ও গুরুদ্বারের পবিত্র অর্থ, রাম জন্মভূমির তহবিল, এমনকি সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবন—সবকিছুই আজকের বিজেপির শাসনে চরম বিপন্ন। তিনি কটাক্ষ করে বলেন, সরকারের ঘোষিত “সবকা সাথ, সবকা বিকাশ”-এর স্লোগানের পরিবর্তে এখন সাধারণ মানুষ বলছেন “বিজেপির সাথ, সবকা সর্বনাশ”। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলিকেও তিনি বিজেপির রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য আবেদন জানান। একইসঙ্গে দেশের সংবাদমাধ্যম এবং বিচারব্যবস্থাকেও গণতন্ত্র রক্ষায় আরও বেশি সক্রিয় ও সাহসী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বার্তা ছিল অত্যন্ত প্রেরণাদায়ক। তিনি বলেন, এই লড়াইয়ে কোনো ধর্ম, বর্ণ বা জাতপাতের বিভেদ থাকা উচিত নয়। আগামী দিনে ‘সেভ ইন্ডিয়া, সেভ ডেমোক্রেসি’ বা ‘ভারত বাঁচাও, গণতন্ত্র বাঁচাও’ স্লোগানকে সামনে রেখে বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার ডাক দিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, যারা ভয় পায় তাদের পতন অবশ্যম্ভাবী। গণতন্ত্র কোনো দমন-পীড়নের বিষয় নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের জন্মগত অধিকারের প্রতীক।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই তীব্র আক্রমণের পাল্টা জবাব দিতে দেরি করেনি বিজেপি। দলের মুখপাত্র সম্বিত পাত্র বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের সম্পর্কে যা ইচ্ছা বলতে পারেন, তাতে কিছু যায় আসে না। আমরা ভীতু নই, বরং সাহসী। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা যে কোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। এই ধরনের ভিত্তিহীন ও মনগড়া অভিযোগে আমরা বিন্দুমাত্র বিচলিত নই।”

উল্লেখ্য, দিল্লির এই ঐতিহাসিক সভা ঘিরে রাজনৈতিক মহলে উত্তাপ তুঙ্গে উঠেছে। একদিকে যেমন বিরোধীরা ঐক্য প্রদর্শনের আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে, অন্যদিকে শাসক পক্ষও তাদের আগের অবস্থানে অনড় থেকে সমস্ত অভিযোগকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। এই ঘটনার পরবর্তী রাজনৈতিক প্রভাব কী হয় এবং বিরোধী জোট কতটা শক্তিশালী হয়ে ওঠে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই দিল্লি সফর ভারতীয় রাজনীতির সমীকরণে নতুন কোনো মোড় নিয়ে আসে কি না, তা নিয়ে চলছে জোর জল্পনা। সাধারণ মানুষের চোখ এখন দেশের আগামীর দিকে।