PC Memory: কম্পিউটারে কি RAM প্রয়োজন নেই? ওপেনএআই প্রধানের মন্তব্যে চাঞ্চল্য

প্রযুক্তি বিশ্বে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কিংবা স্মার্টফোনের অবিচ্ছেদ্য ও অপরিহার্য অংশ হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে পরিচিত ‘র‍্যাম’ বা র‍্যান্ডম অ্যাক্সেস মেমোরি। কোনো যন্ত্রের গতি এবং কর্মদক্ষতা নির্ধারণে এই মেমোরির ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু এই সুপ্রতিষ্ঠিত ধারণা নিয়েই এবার সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যান। তাঁর বিতর্কিত দাবি অনুযায়ী, ব্যক্তিগত কম্পিউটারে অহেতুক র‍্যাম আটকে না রেখে, সেই মেমোরি সম্পদ ডেটা সেন্টারের ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দেওয়া উচিত। বর্তমান বিশ্বজুড়ে মেমোরি চিপের যে তীব্র আকাল এবং সরবরাহ সংকট চলছে, সেই প্রেক্ষাপটে স্যাম অল্টম্যানের এই মন্তব্য প্রযুক্তি মহলে এক তীব্র বিতর্কের সূত্রপাত করেছে।

সম্প্রতি একটি জনপ্রিয় পডকাস্ট আলোচনায় অংশ নিয়ে স্যাম অল্টম্যান এই বিস্ফোরক মন্তব্যটি করেন। তিনি দাবি করেন যে, বর্তমান সময়ে বিশ্ববাজারে ডাইনামিক র‍্যান্ডম অ্যাক্সেস মেমোরি বা ডি-র‍্যাম (DRAM)-এর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামের যে সংকট দেখা দিয়েছে, তার অন্যতম মূল কারণ হলো ব্যক্তিগত ডিভাইসে র‍্যামের চরম অপচয়। অল্টম্যানের ভাষ্যমতে, পৃথিবীর মোট উৎপাদিত র‍্যামের একটি বিশাল অংশ সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ল্যাপটপ বা কম্পিউটারে মূলত অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। তাঁর উপস্থাপিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমাদের ব্যক্তিগত ডিভাইসে থাকা র‍্যামের মাত্র পাঁচ শতাংশ সত্যিকার অর্থে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়। বাকি ৯৫ শতাংশ মেমোরি অলসভাবে পড়ে থাকে। স্যামের মতে, এই সীমিত সম্পদ যদি সাধারণ কম্পিউটারের ব্যক্তিগত ব্যবহারের পরিবর্তে বড় বড় ডেটা সেন্টারে ব্যবহার করা সম্ভব হতো, তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জটিল মডেলগুলোর প্রশিক্ষণ এবং পরিচালন প্রক্রিয়া অনেক বেশি সুষ্ঠু, কার্যকর এবং দ্রুততর হতো।

স্যাম অল্টম্যানের এই মন্তব্যের নেপথ্যে রয়েছে ক্রমবর্ধমান এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চাহিদা। বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি সংস্থা যেমন গুগল, মাইক্রোসফট কিংবা অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এআই প্রযুক্তির ওপর প্রভূত বিনিয়োগ করছে। ওপেনএআই-এর লক্ষ্য হলো আগামী ২০৩০ সাল পর্যন্ত কম্পিউটিং পাওয়ার বা প্রসেসিং ক্ষমতা বৃদ্ধির খাতে প্রায় ৭৫০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। স্যামের চিন্তাধারা অনুযায়ী, ডিভাইসে স্থানীয়ভাবে বা লোকালি এআই মডেল চালানোর চেয়ে ক্লাউড প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হওয়াই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। তাঁর যুক্তি হলো, ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মাধ্যমে অসীম ক্ষমতাকে কাজে লাগানো সম্ভব, যা ব্যক্তিগত ডিভাইসের সীমিত মেমোরি দিয়ে করা প্রায় অসম্ভব।

যদিও প্রযুক্তি প্রেমী এবং স্বাধীন ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ এই চিন্তাধারার ঘোর বিরোধী। তাদের মতে, ওপেন সোর্স মডেলের মাধ্যমে নিজস্ব ডিভাইসে এআই চালানোর সুবিধা থাকলে ডেটা সেন্টারের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা হ্রাস পাবে, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার জন্যও জরুরি। ব্যক্তিগত ডিভাইসে মেমোরি কম থাকলে ব্যবহারকারীর স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বর্তমানে স্যামসাং, মাইক্রন কিংবা এসকে হাইনিক্সের মতো হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র কোম্পানি বিশ্বের সিংহভাগ মেমোরি চিপ বা র‍্যাম তৈরি করে। ডেটা সেন্টারগুলোর বিশাল চাহিদার কারণে তাদের কাছেই চিপের জোগান আগে পৌঁছায়। ক্লাউড পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে তাদের দীর্ঘমেয়াদি ও বিশাল অঙ্কের চুক্তি থাকায়, এই বাজারে সাধারণ ভোক্তা বা ছোটখাটো কম্পিউটার নির্মাতাদের জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এর ফলে র‍্যামের দামও বিশ্ববাজারে ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্মার্টফোন ও ল্যাপটপের খুচরো মূল্যের ওপর। সাধারণ গ্রাহকদের পকেটে টান পড়ছে চিপ নির্মাতাদের এই ব্যবসায়িক কৌশলের কারণে।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, সিলিকন ভ্যালিতে এখন এ নিয়ে রীতিমতো মেরুকরণ শুরু হয়েছে। একদিকে রয়েছে ব্যক্তিগত ডিভাইসে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের পক্ষপাতি বা প্রাইভেসি অ্যাডভোকেটরা, অন্যদিকে স্যাম অল্টম্যানের মতো ক্লাউড-নির্ভরতার প্রবক্তারা। তবে স্যামের এই তত্ত্ব সাধারণ কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, অল্টম্যানের দর্শনের প্রতিফলন ঘটলে ভবিষ্যতে শক্তিশালী হার্ডওয়্যার সংবলিত ব্যক্তিগত কম্পিউটারের সক্ষমতা কমিয়ে শুধুমাত্র ক্লাউড-নির্ভর ‘থিন ক্লায়েন্ট’ ডিভাইস তৈরির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এমনটা ঘটলে কম্পিউটার হবে কেবল একটি মাধ্যম, যেখানে সমস্ত প্রসেসিং হবে বহুদূরের কোনো ডেটা সেন্টারে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ ক্রেতাদের হাতে উন্নত প্রযুক্তি বা শক্তিশালী কম্পিউটারের ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেয় এবং প্রযুক্তি জগত ব্যক্তিগত মালিকানা বনাম ক্লাউড আধিপত্যের এই যুদ্ধে কোন পথ বেছে নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়। প্রযুক্তি প্রেমীরা তাদের নিজস্ব যন্ত্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারানোর আতঙ্কেই এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন।