ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ পর্ষদের আধিকারিক

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন কোম্পানি লিমিটেড বা ডব্লিউবিএসইডিসিএল-এর মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জনসেবামূলক সংস্থায় ঘটে যাওয়া দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্যজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার দুর্নীতি দমন শাখার হাতে এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকের গ্রেফতারের ঘটনাটি প্রশাসনিক স্তরে দুর্নীতির শিকড় কতটা গভীরে বিস্তৃত, তার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ পরিষেবার মতো একটি অপরিহার্য ক্ষেত্রে যখন এই ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে, তখন তা সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের সঞ্চার করে।

তদন্তকারী সংস্থার প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ দিন ধরেই অভিযুক্ত ওই আধিকারিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে, তিনি দাপ্তরিক কাজের বিনিময়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ দাবি করছেন। সরকারি নিয়মানুযায়ী, বিদ্যুৎ সংযোগ বা মিটার সংক্রান্ত যে কোনো সরকারি কাজের জন্য নির্দিষ্ট সরকারি ফি ছাড়া অতিরিক্ত কোনো অর্থ দাবি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ, সেই আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অভিযুক্ত আধিকারিক মাসের পর মাস নিজের পকেট ভরছিলেন বলে অভিযোগ। ভুক্তভোগী এক গ্রাহক, যিনি দীর্ঘ দিন ধরে হয়রানির শিকার হচ্ছিলেন, তিনি শেষ পর্যন্ত হার না মেনে দুর্নীতি দমন শাখার দ্বারস্থ হন। সেই সাহসিকতার ভিত্তিতেই গোয়েন্দারা একটি সুপরিকল্পিত ফাঁদ পাতেন। সোমবার নির্দিষ্ট এলাকায় ঘুষের টাকা গ্রহণ করার সময় হাতেনাতে ওই আধিকারিককে গ্রেফতার করেন দুর্নীতি দমন শাখার বিশেষ তদন্তকারী দল। যদিও তদন্তের স্বার্থে ধৃতের নাম বা তার দপ্তরের সুনির্দিষ্ট অবস্থান এই মুহূর্তে গোপন রাখা হয়েছে, তবে এই গ্রেফতারি যে সরকারি মহলে বড়সড় ঝোড়ো হাওয়া তুলেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বিদ্যুৎ বণ্টন কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সরকারি আধিকারিক জনসেবার নাম করে কোনো প্রকার উপঢৌকন বা অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দাবি করতে পারেন না। কিন্তু সাম্প্রতিক এই ঘটনা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, সরকারি পরিষেবাকে পুঁজি করে কীভাবে একশ্রেণির অসাধু চক্র সাধারণ মানুষকে জিম্মি করছে। দুর্নীতি দমন শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকরা জানিয়েছেন, ধৃতকে জেরা করে এই দুর্নীতির সঙ্গে আর কারা যুক্ত রয়েছে, তা খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। এই চক্রের পেছনে কি কোনো বৃহত্তর সিন্ডিকেট কাজ করছে, না কি এটি ব্যক্তিগত স্তরের দুর্নীতি, তা খুঁজে বের করাই এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য।

এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্নীতির মামলা নয়, বরং রাজ্যস্তরে সরকারি দপ্তরে স্বচ্ছতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে যে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা আবারও জনসমক্ষে উঠে এল। রাজ্যের বিদ্যুৎ দপ্তরের অন্দরেও এই ঘটনায় অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। অতীতেও নানা সময়ে সরকারি দপ্তরে দালালি এবং ঘুষের অভিযোগ উঠেছে, যার ফলস্বরূপ সাধারণ মানুষ এবং প্রকৃত ভুক্তভোগীরা সরকারি প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজ্য প্রশাসন দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করলেও, মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র যে কতটা উদ্বেগজনক, তা এই গ্রেফতারের ঘটনায় পরিষ্কার।

গোয়েন্দা সূত্র মারফত জানা গিয়েছে যে, ধৃত আধিকারিককে আজই আদালতে পেশ করা হবে এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাবেন তদন্তকারীরা। ধৃতের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যাংক লেনদেনের ওপর গোয়েন্দারা বিশেষ নজর রাখছেন। তার আয়ের উৎস এবং গত কয়েক মাসে তিনি কত জনের কাছ থেকে একইভাবে টাকা তুলেছেন, তার একটি বিস্তৃত তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। তদন্তের পরিধি আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে আরও বেশ কিছু ব্যক্তিকে জেরা করা হতে পারে।

বিদ্যুৎ পর্ষদের মতো পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থায় এই ধরনের দুর্নীতি সাধারণ গ্রাহকদের জন্য বড় ধরনের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে নতুন সংযোগ নেওয়া, মিটার পরিবর্তন বা লোড বাড়ানোর মতো কাজগুলো করতে গিয়ে সাধারণ গ্রাহকরা যখন ঘুষ দিতে অস্বীকার করেন, তখন তাদের ফাইল মাসের পর মাস লাল ফিতের বাঁধনে আটকে রাখা হয়। এই ঘটনার পর বিদ্যুৎ দপ্তরের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট আরও প্রকট হতে পারে। প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে এখন কঠোর নজরদারি বজায় রাখাই মূল চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল। তদন্তের পরবর্তী ধাপে আর কোনো বড় রাঘব বোয়ালের নাম সামনে আসে কি না বা এই চক্রের জাল কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত, সেদিকেই এখন নজর রাখছে ওয়াকিবহাল মহল। মানুষ এখন স্বচ্ছ এবং নিরবচ্ছিন্ন পরিষেবা পাওয়ার দাবিতে সরব হচ্ছে, আর সেই পরিস্থিতিতে এই গ্রেফতারি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি প্রথম পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।