তৃণমূল জমানার প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেফতারি ও আর্থিক দুর্নীতির জাল: তদন্তের গভীরে চাঞ্চল্যকর তথ্য
কলকাতা: কোটি কোটি টাকার আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে অবশেষে গ্রেফতার হলেন তৃণমূল জমানার প্রাক্তন তথ্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই তদন্তে এবার নয়া মোড় তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-এর নথিতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উঠে আসায় রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। দুর্নীতির টাকা কোন পথে ঘুরপথে পৌঁছেছিল, সেই অর্থের উৎস ও গন্তব্য এখন তদন্তকারীদের প্রধান নিশানায় রয়েছে। এই ঘটনাটি রাজ্যের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক বিশাল ভূমিকম্পের সৃষ্টি করেছে।
ইন্দ্রনীল সেন তৃণমূল সরকারের আমলে দুই দফায় বিধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৬ সাল থেকে তিনি তৎকালীন মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের দায়িত্ব সামলেছেন। বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর বিশেষ প্রভাব সর্বজনবিদিত ছিল। অভিযোগ উঠেছে যে, ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে দুর্গাপূজার পাস বিক্রির আড়ালে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। এই বিশেষ মামলাতেই কলকাতা পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করেছে। একইসাথে, আর্থিক তছরুপ বা মানি লন্ডারিংয়ের দিকটি খতিয়ে দেখছে ইডি।
তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রী থাকাকালীন ইন্দ্রনীল সেন তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দুই সহযোগী ধ্রুবজ্যোতি বসু ও দীপেশ রায়ের সংস্থাকে প্রায় ৮৫ কোটি টাকার বেশি সরকারি টেন্ডার পাইয়ে দিয়েছিলেন। নিয়মবহির্ভূতভাবে এবং গোপন আঁতাতের মাধ্যমে এই টেন্ডারগুলি দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। পরবর্তীতে সেই সংস্থা থেকে টাকা ঘুরপথে ইন্দ্রনীল সেনের আত্মীয়দের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন ভুয়ো সংস্থায় পাঠানো হয়। ইডি-র নথিতে স্পষ্টভাবে দাবি করা হয়েছে যে, সেই সংস্থাগুলি থেকে আবার বড় অঙ্কের টাকা নগদে তোলা হয়েছে, যা মূলত কালো টাকা সাদা করার একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
তদন্তে আরও একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ‘অকটেভ রেকর্ডস’ নামে ইন্দ্রনীল সেনের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন একটি সংস্থায় ৩ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা জমা পড়েছিল। ইডি-র দাবিমতে, এই অ্যাকাউন্ট থেকেই ৩০ লক্ষ টাকা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় এজেন্সির জিজ্ঞাসাবাদের মুখে ইন্দ্রনীল সেন দাবি করেছিলেন যে, রয়্যালটি হিসেবেই ওই টাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছিল। তবে ইডি এই যুক্তি মানতে নারাজ। তদন্তকারীদের মতে, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে এভাবে সরকারি দুর্নীতির টাকা রয়্যালটির মোড়কে ঢোকানো আর্থিক তছরুপের আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা এখন ওই লেনদেনের আসল উৎস খতিয়ে দেখছেন।
এই ঘটনা নিয়ে রাজ্যের বর্তমান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, ইন্দ্রনীল সেন একা এই দুর্নীতির সুবিধাভোগী নন। তাঁর কথায়, “ইন্দ্রনীল একা খায়নি, এর সাথে আরও অনেকে যুক্ত। সঠিক সময়ে এই দুর্নীতির শিকড় অনেক ওপর পর্যন্ত পৌঁছাবে এবং বড় জায়গায় হাত পড়বে।” বিরোধী দল তথা সাধারণ মানুষের মধ্যে এই মন্তব্য ঘিরে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। যদিও অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি এখনও পাওয়া যায়নি। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ নীরবতা পালন করছেন।
কলকাতা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর এখন ইন্দ্রনীল সেনকে দফায় দফায় জেরা করে পুলিশ এই দুর্নীতির নতুন কোনো সূত্র পায় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। পুলিশের পাশাপাশি ইডি-র তদন্তকারীরাও এই বিশাল আর্থিক কেলেঙ্কারির শিকড় পর্যন্ত পৌঁছাতে তৎপর। ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্য, সম্পত্তির নথিপত্র এবং ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই তদন্ত যত এগোবে, ততই আরও অনেক রাঘববোয়ালের নাম সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঘটনাটি রাজ্যের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক স্তরে যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা বলাই বাহুল্য। রাজ্যের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের নামে যেভাবে টাকার শ্রাদ্ধ হয়েছে, তা নিয়ে সাধারণ নাগরিক সমাজ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছে। দুর্নীতির এই দীর্ঘ কাহিনী কি কেবল একজন প্রাক্তন মন্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এর পেছনে থাকা অদৃশ্য ক্ষমতার উৎস উন্মোচিত হবে—সেই উত্তর পাওয়ার জন্য রাজ্যবাসী এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। তদন্তের প্রতিটি ধাপ এখন রাজ্যের রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করছে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।







