নতুন শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞা, ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

কলকাতা: রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে এবং শিক্ষার পবিত্রতা রক্ষা করতে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মঙ্গলবার নবান্নে আয়োজিত রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী সুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছেন যে, এখন থেকে নতুন নিযুক্ত কোনও শিক্ষক-শিক্ষিকা প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন না। এই সিদ্ধান্ত রাজ্যের শিক্ষা দপ্তরের নিয়োগ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলির মডেল অনুসরণ করেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই নীতি গ্রহণ করেছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, আজকের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পর থেকে যে সমস্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ করা হবে, তাঁরা লোকসভা, বিধানসভা, পুরসভা বা পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। অর্থাৎ সরাসরি দলীয় রাজনীতি থেকে তাঁদের দূরে থাকতে হবে। তবে, বর্তমানে যারা শিক্ষকতা করছেন এবং রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, তাঁদের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে না বলেও মুখ্যমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন।

শিক্ষার মান উন্নয়ন প্রসঙ্গে বিরোধী দল ও অতীতের শাসনব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক দশকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা অনেকটা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। শিক্ষার মন্দিরকে রাজনীতিমুক্ত করে শিক্ষকদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনাই এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য। তিনি দাবি করেন, স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে এই নতুন নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে, যা আগামীর ছাত্রছাত্রীদের জন্য একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করবে।

এদিনের ক্যাবিনেট বৈঠকে কেবল শিক্ষা সংক্রান্ত নীতিই নয়, আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, চোরবাগানে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় প্রয়াত ১৯ জন নাগরিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মন্ত্রিসভার শুরুতে নীরবতা পালন করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় মৃতদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে রাজ্য সরকার বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট পরিবারের সম্মতিতে তাদের বাড়ির একজনকে চতুর্থ শ্রেণির কর্মী হিসেবে সরাসরি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার তদারকি করবেন জেলাশাসকরা এবং কলকাতার ক্ষেত্রে কলকাতা পৌরসংস্থা নিয়োগকর্তার ভূমিকা পালন করবে। তবে, বিহারের বাসিন্দা মৃত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ডোমিসাইল সার্টিফিকেট না থাকায় তাঁদের পরিবারকে নিয়োগপত্র দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁদের পরিবারের হাতে ২৫ লক্ষ টাকা করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ তুলে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী উমেশ রাইকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন।

পাশাপাশি, রাজ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রায় ১২০০ নতুন পদ সৃষ্টির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পূর্ববর্তী মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রায় ৪৫ হাজার নতুন পোস্ট তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রক্রিয়ার অঙ্গ হিসেবেই এই নতুন পদগুলো তৈরি করা হয়েছে। খুব শীঘ্রই সরকারি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই পদগুলোতে পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ করা হবে বলেও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যের সরকারি পরিষেবাকে আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ করার লক্ষ্যে এই নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ার ওপর রাজ্য সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে নবান্ন সূত্রের খবর।

মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে রাজ্য রাজনীতির প্রেক্ষিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়ার যে দাবি তিনি করেছেন, তা বাস্তবায়িত হলে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আসতে পারে বলে প্রশাসনিক মহলের অভিমত। তবে এই নতুন নিয়মের রূপরেখা এবং তা কীভাবে কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বিজ্ঞপ্তি খুব শীঘ্রই শিক্ষা দপ্তর থেকে প্রকাশ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।