কলকাতার কালীঘাটে ঘটে যাওয়া এক চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক ঘটনায় রাজ্য রাজনীতির আঙিনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বিরোধী দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত সুরক্ষিত বাসভবনের অদূরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটির পর সমগ্র এলাকা নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয়েছে। মঙ্গলবার দুর্গাপূজার প্রাক্কালে যখন শহর জুড়ে উৎসবের আমেজ, ঠিক সেই মুহূর্তেই এই হামলা চেষ্টার ঘটনাটি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক বিশাল বড় গাফিলতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পুলিশি সূত্রে প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন সিভিক ভলান্টিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার দিন তিনি মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ওই ব্যক্তির হাতে একটি ধারালো ছুরি ছিল, যা নিয়ে তিনি সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে এগিয়ে আসার দুঃসাহস দেখান। ঘটনাস্থলটি ছিল মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের একেবারে কাছে, যেখানে তিনি একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য বেরোচ্ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের বয়ান থেকে জানা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি আচমকাই ভিড় ঠেলে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সুরক্ষা বলয়ের দিকে ধেয়ে আসেন। তার শারীরিক ভাষা ও আচরণ ছিল অত্যন্ত অসংলগ্ন। তিনি চিৎকার করে অত্যন্ত আপত্তিকর ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন, যা উপস্থিত সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করে তোলে। তবে মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে পরিস্থিতি সামাল দেন। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে ওই ব্যক্তি ভারসাম্য হারিয়ে রাস্তার ওপর আছড়ে পড়েন। নিরাপত্তা রক্ষীরা দ্রুত তাকে পাকড়াও করেন এবং তার হাত থেকে ধারালো অস্ত্রটি উদ্ধার করেন।
এই ঘটনার পরেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। একদিকে যেমন রাজ্যের বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনার পেছনে গভীর ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছে, অন্যদিকে রাজ্যের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিজেপির দিকেও সমালোচনার আঙুল তোলা হচ্ছে। রাজনৈতিক উত্তাপ এবং পারস্পরিক দোষারোপের এই খেলায় সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে একজন ভিআইপি (VVIP) ব্যক্তিত্বের নিরাপত্তা বলয় ভেঙে একজন সশস্ত্র ব্যক্তি কীভাবে এত কাছাকাছি পৌঁছে গেলেন, তা নিয়ে কলকাতা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে।
ঘটনার পরপরই কলকাতা পুলিশ অতিসক্রিয় হয়ে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ঘটনাস্থলের আশেপাশে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজগুলো বিশদভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গোয়েন্দা বিভাগের একটি বিশেষ দল এলাকার মানুষজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। সিভিক ভলান্টিয়ারের পরিচয় ও তার এমন উগ্র আচরণের পেছনে নিছক মদ্যপানজনিত ভারসাম্যহীনতা কাজ করেছে, নাকি কোনো সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে, তা নিয়ে তদন্তকারীরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। অভিযুক্তের মানসিক অবস্থা পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং তার ব্যক্তিগত কোনো ক্ষোভের কারণ ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে এবং কাউকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (জেড প্লাস ক্যাটাগরির সুরক্ষায় নিয়োজিত কমান্ডোরা) ঘটনার পর থেকে আরও সতর্ক ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। কালীঘাট এলাকাটি সবসময়ই জনাকীর্ণ থাকে, তার ওপর দুর্গাপূজার মরসুমে জনস্রোত কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন ভিড়ের মধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই ছিদ্র সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে চরম ভীতি সঞ্চার করেছে। স্থানীয় তৃণমূল নেতৃবৃন্দ এই ঘটনাকে নিছক ব্যক্তিগত আক্রমণ বলে মানতে নারাজ। তাদের দাবি, এটি রাজ্য সরকারের নিরাপত্তার চূড়ান্ত ব্যর্থতা এবং একটি বড় ষড়যন্ত্রের অংশ।
অন্যদিকে, প্রশাসন ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে সর্বস্তরের মানুষকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আপাতত কালীঘাট এলাকাটি কড়া পুলিশি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। গোয়েন্দা বিভাগের আধিকারিকরা অভিযুক্তকে দফায় দফায় জেরা করছেন, যাতে ঘটনার আসল সত্যতা উদঘাটিত হয়। পূজার আনন্দের মাঝে এমন এক আতঙ্কের ঘটনায় শহরবাসী রীতিমতো স্তম্ভিত। সাধারণ মানুষ এখন প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন এবং প্রকৃত দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন। এই ঘটনার রেশ ধরে আগামী দিনে রাজ্য জুড়ে রাজনৈতিক টানাপোড়েন যে আরও বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।








