প্যারিসের গঙ্গে সুর সেন উৎসবে বাদল সরকারের ‘পাগলা ঘোড়া’র প্রদর্শনী

কলকাতার নাট্য ও চলচ্চিত্র জগতের আকাশে এক নতুন নক্ষত্রের উদয় হয়েছে। কিংবদন্তি নাট্যব্যক্তিত্ব বাদল সরকারের কালজয়ী নাটক ‘পাগলা ঘোড়া’-র ওপর ভিত্তি করে নির্মিত শেখর দাসের চলচ্চিত্রটি এখন বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত হওয়ার অপেক্ষায়। প্যারিসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী ‘গঙ্গে সুর সেন’ চলচ্চিত্র উৎসবে উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে এই শিল্পকর্মটি। ফরাসি মাটিতে বাংলার এই সাংস্কৃতিক উত্তরণ শুধু চলচ্চিত্র নির্মাতাদের নয়, বরং সমস্ত বাংলা সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের জন্য এক পরম গর্বের মুহূর্ত।

এই চলচ্চিত্রের মূল প্রেক্ষাপট আবর্তিত হয়েছে এক শ্মশানকে কেন্দ্র করে। বৃষ্টির রাত, জনমানবহীন শ্মশানের পরিবেশ এবং সেখানে চারজন পুরুষের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে এক বিষাদময় আবহ। তারা সেখানে উপস্থিত হয়েছে এক তরুণীর শেষকৃত্যের অপেক্ষায়। এই অপেক্ষার প্রহরগুলোই ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে জীবনের গভীরতর ও জটিল সমীকরণগুলোকে। এটি কেবল একটি শেষকৃত্যের দৃশ্য বা কোনো সাধারণ গল্প নয়, বরং এই চলচ্চিত্রটি মানুষের মনের নিভৃততম কোণে জমে থাকা আবেগ, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং জীবনের অনিবার্য সত্যকে অস্বীকার করার যে মানসিক যন্ত্রণা, তার এক নির্মম ও বাস্তব দলিল। পরিচালক শেখর দাস অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সঙ্গে বাদল সরকারের নাটকের মূল দর্শনকে নিজের ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী করেছেন, যা দর্শকদের বারবার ভাবনার সাগরে নিমজ্জিত করবে।

উৎসবের মঞ্চে এই ছবির অন্তর্ভুক্তি প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ছবির প্রযোজক বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এই আখ্যান কেবল বাংলা ভাষা বা নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যদিও এই গল্পের শিকড় বাংলায় প্রোথিত, কিন্তু এর বিষয়বস্তুর গভীরতা এবং সর্বজনীনতা একে বিশ্বজনীন করে তুলেছে। জীবনের ভঙ্গুরতা এবং সম্পর্কের বুনন এমন শৈল্পিক আঙ্গিকে এখানে তুলে ধরা হয়েছে, যা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের হৃদয়কেই নাড়া দিতে সক্ষম। প্যারিসের মতো বিশ্ব চলচ্চিত্রের পীঠস্থানে এই ছবির প্রদর্শনী বাংলা চলচ্চিত্রকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে যখন নানা সমীকরণ চলছে, তখন রাজ্যের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হিসেবে বিদেশের মাটিতে এমন সাফল্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের বর্তমান শাসক দল বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধী আসনে রয়েছে। এই রাজনৈতিক মেরুকরণের আবহে দাঁড়িয়ে রাজ্যের শিল্পীরা যখন বিশ্বমঞ্চে বাংলার নাম উজ্জ্বল করেন, তা বৃহত্তর জনমানসে এক ইতিবাচক বার্তা বহন করে। শিল্প যে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতার জয়গান গাইতে পারে, এই চলচ্চিত্রের সাফল্য তা আবারও প্রমাণ করল।

‘পাগলা ঘোড়া’-র মতো একটি ধ্রুপদী কাজকে আধুনিক চলচ্চিত্রের রূপ দেওয়ার কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। নাটকের সেই চিরন্তন আবেদন এবং প্রতিটি চরিত্রের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্বগুলোকে রূপালি পর্দায় জীবন্ত করে তুলতে পরিচালককে বেশ কিছু সৃজনশীল চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয়েছে। শ্মশানের পটভূমিতে চার পুরুষের কথোপকথন, তাদের অতীত স্মৃতিচারণ এবং নারী চরিত্রের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি—সব মিলিয়ে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সফর এই চলচ্চিত্র। উৎসব কর্তৃপক্ষ মনে করছে, আন্তর্জাতিক দর্শকরা এই ছবির মূল ভাবটিকে সহজেই হৃদয়ে ধারণ করতে পারবেন, কারণ প্রতিটি চরিত্রই যেন আমাদের চেনা পৃথিবীরই প্রতিচ্ছবি।

প্যারিসের গঙ্গে সুর সেন উৎসবে যোগ দেওয়ার জন্য কলাকুশলীরা ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি শুরু করেছেন। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা চলচ্চিত্র অনুরাগীরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন এই বিশেষ প্রদর্শনীটির জন্য। বাংলার সৃজনশীলতা যে বিশ্বমানের, তা আবারও প্রমাণিত হলো এই খবরের মাধ্যমে। এই উৎসবের মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলা চলচ্চিত্রের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। বিস্তারিত তথ্য, যেমন অনুষ্ঠানের সঠিক সময় বা সূচি সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, অদূর ভবিষ্যতে এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে। তবে প্যারিসের এই উৎসবে বাঙালির এই সাংস্কৃতিক উপস্থিতি যে অত্যন্ত গর্বের, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলা চলচ্চিত্র আজ বিশ্বদরবারে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী আসনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে, যার পেছনে রয়েছে একদল নিষ্ঠাবান শিল্পীর নিরলস সাধনা।