কলকাতা: নিট প্রতিবাদে ধৃত ১৬ জনের জামিন, সুপ্রিম নির্দেশে বদল রায়

কলকাতা হাইকোর্ট এবং সংশ্লিষ্ট নিম্ন আদালতের দীর্ঘ আইনি টানাপোড়েন ও জটিল পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে অবশেষে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন নিট (এন.আই.ই.টি) পরীক্ষার্থী এবং তাদের সমর্থনে রাজপথে নেমে প্রতিবাদে অংশ নেওয়া ১৬ জন আন্দোলনকারী। সোমবার বিকেলে কলকাতা আদালত চত্বরে এক অত্যন্ত নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে আদালত তার পূর্বের রায় সংশোধন করতে বাধ্য হয় এবং এই ১৬ জনকে জামিন দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করে। উল্লেখ্য যে, ঘটনার শুরুতে নিম্ন আদালত ধৃতদের জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছিল, যা নিয়ে আইনি মহলে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল। তবে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশের গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এনে আদালত নিজের পূর্বের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে জামিনের আদেশ দেয়।

ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল নিট পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগে আয়োজিত একটি প্রতিবাদ মিছিলকে কেন্দ্র করে। দেশের কয়েক লক্ষ পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ জড়িয়ে থাকা এই পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে যখন দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন কলকাতার রাজপথেও পড়ুয়াদের একটি অংশ সরব হয়েছিল। এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অশান্তির অভিযোগ তুলে পুলিশ ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করে। সোমবার সকালে যখন ধৃতদের নিম্ন আদালতে পেশ করা হয়, তখন বিচারক প্রাথমিক শুনানির পর তাদের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই সুপ্রিম কোর্টের তরফ থেকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নজিরবিহীন নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়। দেশের সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, নিট সংক্রান্ত যৌক্তিক প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী ছাত্রছাত্রী বা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার কঠোর বা দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না। সর্বোচ্চ আদালতের এই কঠোর বার্তার পরেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ঘুরে যায়।

আইনজীবীদের দ্রুত তৎপরতায় সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশিকা তৎক্ষণাৎ নিম্ন আদালতের নজরে আনা হয়। আদালতের মর্যাদা রক্ষা এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ পালনে নিম্ন আদালত পুনরায় বিষয়টি শুনানির জন্য গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। বিকেল তিনটের মধ্যে এই দ্বিতীয় দফার শুনানি সম্পন্ন হয় এবং জেল হেফাজতের পরিবর্তে ধৃত ১৬ জনকে জামিনে মুক্তি দেওয়ার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। বিশিষ্ট আইনজীবীদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ না থাকলে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন হতো।

ধৃতদের বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই ১৬ জনের মধ্যে ১০ জনের বিরুদ্ধে অতীতে কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই। অর্থাৎ, আইনত তারা সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং শুধুমাত্র প্রতিবাদের কারণে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বাকি ৬ জনের বিরুদ্ধে পুরনো কিছু মামলা পেন্ডিং বা বিচারাধীন রয়েছে। এই পার্থক্যটি আদালতে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও এদিন একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে জানানো হয়েছে যে, যে সমস্ত ছাত্রছাত্রীর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের পূর্ব ইতিহাস বা রেকর্ড নেই, তাদের সুরক্ষার বিষয়টি সরকার যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তবে যাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই মামলা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া বা প্রচলিত বিধি অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর।

এদিন আদালত চত্বরে ধৃতদের আত্মীয়, পরিবারবর্গ এবং শুভানুধ্যায়ীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। জামিনের খবর ছড়াতেই আদালতে উপস্থিত পরিবারগুলোর মধ্যে স্বস্তির নিঃশ্বাস এবং আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক অবস্থানের পর এটি আবারও স্পষ্ট হয়েছে যে, গণতান্ত্রিক দেশে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারকে সুনিশ্চিত করতে বিচারব্যবস্থা অত্যন্ত সংবেদনশীল। ধৃতদের আইনজীবী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, আইনি প্রক্রিয়া মেনে আজ বিকেলের মধ্যেই তাদের জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি সম্পন্ন করা হয়েছে এবং দ্রুতই তারা মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারবেন।

এই পুরো ঘটনাটি নিট পরীক্ষার অনিয়মের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে চলা ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশের প্রভাব আগামী দিনে দেশের অন্যান্য রাজ্যে বা অন্যান্য আন্দোলনের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে এখন রাজনৈতিক ও আইনি মহলে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। আপাতত কলকাতার আদালতে ধৃত ১৬ জনের এই জামিন প্রাপ্তি আন্দোলনে যুক্ত পড়ুয়াদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ও মনোবল ফিরিয়ে এনেছে। মামলার পরবর্তী শুনানি বা ভবিষ্যৎ আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে বিশদ তথ্য আপাতত উপলব্ধ নয়, তবে রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে চর্চা ও পর্যালোচনার অবকাশ তৈরি হয়েছে। ন্যায়বিচারের এই জয় সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও সুদৃঢ় করল।