ফুটবল জ্বরে কাঁপছে কলকাতা, রেকর্ড বিক্রি লিওনেল মেসির জার্সির

বিশ্ব ফুটবলের মহারণে ফের একবার মেতে উঠেছে তিলোত্তমা। বিশ্বকাপের উন্মাদনা আর লিওনেল মেসির প্রতি ভালোবাসার সংমিশ্রণে এবার কলকাতার বাজারে যেন এক অভূতপূর্ব জোয়ার এসেছে। ক্রীড়াপ্রেমী বাঙালির আবেগের কেন্দ্রে বরাবরই থাকেন আর্জেন্টাইন জাদুকর। সেই আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে বড় বড় স্পোর্টস শপগুলোতে। জার্সি বিক্রির যাবতীয় রেকর্ড ভেঙে এবার এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে মেসির নীল-সাদা জার্সি। শহরের ব্যবসায়ীদের মতে, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এই বছর জার্সির চাহিদা কয়েক গুণ বেশি।

কলকাতার ময়দান থেকে শুরু করে নিউ মার্কেট, হাতিবাগান কিংবা গড়িয়াহাটের মতো জনবহুল এলাকায় জার্সি বিক্রির দোকানগুলোতে এখন উপচে পড়া ভিড়। তরুণ প্রজন্মের পাশাপাশি বয়স্ক মানুষজনও প্রিয় তারকার জার্সি গায়ে জড়িয়ে নিজেদের সমর্থনের বার্তা দিচ্ছেন। দোকানদাররা জানাচ্ছেন, দোকানের ঝাঁপ খোলার পর থেকেই শুরু হয়ে যাচ্ছে ক্রেতাদের আনাগোনা। বিশেষভাবে ১০ নম্বর লেখা মেসির জার্সি কেনার জন্য রীতিমতো লাইন দিতে হচ্ছে অনেক জায়গায়। চাহিদার তুলনায় জোগান বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন বিক্রেতারা। পাইকারি বাজারগুলোতেও এখন কেবলই মেসির জার্সির চাহিদা তুঙ্গে।

ক্রীড়া সরঞ্জামের অন্যতম বড় বিক্রেতা সংস্থার এক প্রতিনিধি জানালেন, আগে বড় টুর্নামেন্টের সময় বিক্রি ভালো হতো, কিন্তু এবারের উন্মাদনা সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গেছে। অনেকেই আবার পরিবারের সকলের জন্য একই রকম জার্সি কিনছেন। শুধু শোরুম নয়, অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও কলকাতার আইপি অ্যাড্রেস থেকে মেসির মার্চেন্ডাইজ সার্চের পরিমাণ অনেক বেশি। বিশ্ব ফুটবলের এই মহোৎসবে মেসির জার্সি যেন এক অনন্য ‘স্টেটমেন্ট’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের প্রতিটি কোণে নীল-সাদার ছড়াছড়ি বলে দিচ্ছে, আর্জেন্টিনা বা মেসি ঠিক কতটা গভীরে গেঁথে আছেন বাঙালির হৃদয়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুটবল উন্মাদনার এই শহর বরাবরই কিছুটা আলাদা। এখানে কেবল খেলা দেখা নয়, খেলার সাথে জড়িয়ে থাকা আবেগটাই বড়। মেসির খেলা দেখার জন্য মধ্যরাত পর্যন্ত জেগে থাকা কিংবা প্রিয় দলের পতাকায় বাড়ি সাজানো—সবই কলকাতার এক চিরন্তন ছবি। এবারের এই রেকর্ড বিক্রি সেই চিরন্তন ভালোবাসারই প্রতিফলন। অনেক দোকানদার জানিয়েছেন, স্টকে মাল শেষ হয়ে গেলেও ক্রেতাদের চাপ কমছে না। তারা অগ্রিম টাকা দিয়ে অর্ডার বুক করে যাচ্ছেন। কিছু কারিগর আবার ঘরোয়া পদ্ধতিতে মেসির জার্সি তৈরি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছেন, যা আরও একবার প্রমাণ করে যে ফুটবলের জোয়ারে অর্থনীতির চাকাও সচল হয়।

কলকাতার বিভিন্ন ক্লাবেও বড় স্ক্রিনে খেলা দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানেও সমর্থকদের মূল আকর্ষণ মেসি। তাই গ্যালারিতে বসার আগে পছন্দের জার্সিটি পরে নেওয়া যেন এক বাধ্যতামূলক আচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের জন্মদিনের উপহার হিসেবেও মেসির জার্সি বেছে নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে, এই মরশুমে কলকাতার অর্থনীতি ও জনজীবনে এক বড় প্রভাব ফেলেছে লিওনেল মেসির এই জনপ্রিয়তা। এই উচ্ছ্বাস কবে থিতু হবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে একটা কথা স্পষ্ট, মেসির জাদু এখনো অটুট কলকাতার বুকে।

উল্লেখ্য যে, মোট কত কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে বা ঠিক কত লক্ষ জার্সি বিক্রি হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্য বর্তমান প্রতিবেদনে উপলব্ধ নয়। তবে ব্যবসায়ীদের সামগ্রিক প্রতিক্রিয়া ও বাজারের পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এটি গত এক দশকের মধ্যে সর্বাধিক বিক্রির রেকর্ড। শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ভিড় সামলাতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকেও অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে দেখা গেছে। মাঠের লড়াইয়ে মেসি কতটা সাফল্য পাবেন, তা সময় বলবে, কিন্তু মাঠের বাইরে কলকাতার মানুষের মনে তিনি যে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছেন, তা আজকের বিক্রির পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দিচ্ছে। উৎসবের আবহে কলকাতা এখন পুরোপুরি নীল-সাদা রঙে রাঙা।