কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আজ একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গ তথা সমগ্র বাংলার সমৃদ্ধ ও গৌরবময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর আলোকপাত করেন। ‘মিউজিয়াম অফ ওয়ার্ড’ বা শব্দ সংগ্রহশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন যে, ভারতবর্ষের বহুভাষিক চেতনা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মূল প্রাণকেন্দ্র ও চালিকাশক্তি হলো বাংলা। একসময়ে বাংলা যেভাবে সমগ্র বিশ্বের কাছে জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প ও সংস্কৃতির প্রধান পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত ছিল, সেই হারানো গৌরব ও আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের উপযুক্ত সময় এখন সমাগত বলে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের ভাষার অপূর্ব মেলবন্ধন এবং সেই ভাষার অন্তর্নিহিত অসীম শক্তিকে জনসমক্ষে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শব্দই হলো যেকোনো সভ্যতার প্রধান ধারক ও বাহক। মানুষের চিন্তা, দর্শন এবং জীবনবোধের প্রতিফলন ঘটে ভাষার মাধ্যমেই। ভারতের আত্মা ও তার অখন্ডতা নিহিত রয়েছে তার বিভিন্ন ভাষার বিচিত্র শব্দভাণ্ডারের মধ্যে। এই অত্যাধুনিক শব্দ সংগ্রহশালা বা ‘মিউজিয়াম অফ ওয়ার্ড’ তৈরির প্রধান উদ্দেশ্য হলো ভারতের বৈচিত্র্যময় ভাষাগত ঐতিহ্যকে সঠিকভাবে নথিভুক্ত করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা অবিকৃতভাবে পৌঁছে দেওয়া। তিনি স্পষ্ট করেন যে, পশ্চিমবঙ্গ কেবল ভারতের মানচিত্রের একটি রাজ্য নয়, বরং এটি ভারতের সাংস্কৃতিক জাগরণের এক অবিচ্ছেদ্য এবং শক্তিশালী অঙ্গ।
অমিত শাহের কথায়, বাঙালির মণীষা, জ্ঞানচর্চা এবং শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা একসময় গোটা পৃথিবীকে পথ দেখিয়েছে। রবীন্দ্রসংগীত থেকে শুরু করে বিভিন্ন কালজয়ী সাহিত্যকৃতি আজও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত এবং গবেষণার বিষয়বস্তু। এই মহান ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বর্তমান প্রজন্মকে আরও বেশি সক্রিয় এবং সচেতন হতে হবে। তিনি এই সংগ্রহশালার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন যে, এটি দেশের শিক্ষা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। ভাষাকে কেবল প্রতিদিনের যোগাযোগের সাধারণ মাধ্যম হিসেবে না দেখে, তাকে সংস্কৃতির দর্পণ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে যখন বিশ্বায়নের প্রভাবে পৃথিবী অনেকটা সংকুচিত হয়ে আসছে, তখন নিজ মাতৃভাষার অস্তিত্ব রক্ষা করা এবং তাকে বিশ্বমঞ্চে সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত করা অত্যন্ত জরুরি। বাংলার অগণিত কবি, লেখক, সুরকার এবং দার্শনিকদের কালজয়ী অবদানকে স্মরণ করে তিনি বলেন, বাংলার উর্বর মাটি থেকে উঠে আসা মহামানবদের আদর্শই হতে পারে আজকের অস্থির বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার চাবিকাঠি। এই মিউজিয়াম তরুণ প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের সন্ধান দেবে এবং ভাষাগত অভিন্নতার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য ও সংহতিকে আরও সুদৃঢ় করবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী এবং শিক্ষাবিদগণ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। আয়োজকদের পক্ষ থেকে বিস্তারিতভাবে জানানো হয়েছে যে, এই সংগ্রহশালায় ভারতীয় ভাষাগুলোর বিবর্তন, বিভিন্ন শব্দের উৎপত্তিস্থল, প্রাচীন লিপি এবং লোকগাথা থেকে সংগ্রহ করা দুষ্প্রাপ্য শব্দসম্ভার সংরক্ষিত থাকবে। এর ফলে দেশের গবেষক এবং শিক্ষার্থীরা সরাসরি উপকৃত হবেন। এটি কোনো সাধারণ সংগ্রহশালা বা নিছক প্রদর্শনশালা নয়, বরং ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনকেন্দ্র হয়ে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গ যদি তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের চর্চাকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে অব্যাহত রাখে, তবে তা কেবল ভারতের নয়, গোটা বিশ্বের কাছে একটি উজ্জ্বল আদর্শে পরিণত হবে। তিনি এই মিউজিয়াম নির্মাণের সঙ্গে জড়িত সকল কারিগর, বিশেষজ্ঞ এবং কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান এবং আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, এই কেন্দ্রটি আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক পর্যটনের ক্ষেত্রেও এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করবে। অনুষ্ঠানের শেষে তিনি মিউজিয়ামের বিভিন্ন গ্যালারি ঘুরে দেখেন এবং প্রদর্শিত বস্তুগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে ভবিষ্যতে এই ধরনের আরও গঠনমূলক উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য জানা না গেলেও, এই অনুষ্ঠানটি যে ভাষাপ্রেমী মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছে, তা বলাই বাহুল্য। পরিশেষে, ভাষার প্রতি এই দায়বদ্ধতা ভারতের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের বার্তাকে আরও শক্তিশালী করল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকরা।








