সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে ফের একবার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এল। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, মেটার মালিকানাধীন এই দুই জনপ্রিয় মাধ্যমে এমন কিছু বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হয়েছে, যা মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে কোনো ব্যক্তির ছবি থেকে পোশাক সরিয়ে ফেলার বা ‘নিউডিফাই’ (Nudify) করার মতো জঘন্য কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই ঘটনাটি প্রযুক্তি বিশ্বে বড় ধরনের নিরাপত্তা ও নৈতিকতার প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। জানা গেছে, এই বিজ্ঞাপনগুলির নেপথ্যে ছিল চিনভিত্তিক বিভিন্ন গোষ্ঠী। এই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সম্মান চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ধরনের এআই টুল ব্যবহার করে যেকোনো সাধারণ মানুষের ছবি থেকে মুহূর্তের মধ্যে আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, যার কোনো সম্মতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির থাকে না। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক শোরগোল শুরু হয়েছে। ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে কীভাবে এমন আপত্তিকর বিজ্ঞাপনের প্রচার চালানো সম্ভব হলো, তা নিয়ে এখন মেটা কর্তৃপক্ষের ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন নেটিজেনরা। যদিও মেটা কর্তৃপক্ষ তাদের পলিসি অনুযায়ী এই ধরনের বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে, কিন্তু বাস্তব চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশারদরা।
উল্লেখ্য যে, সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘টেক ইট ডাউন অ্যাক্ট’ (Take It Down Act) নামে একটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এই নতুন আইনে সম্মতিবিহীন যৌন কনটেন্ট বা ছবি প্রকাশ করাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। আইনটির মূল উদ্দেশ্য হলো ইন্টারনেটের অন্ধকার জগতে ছড়িয়ে পড়া এই ধরনের অশালীন এবং অনিয়ন্ত্রিত কার্যকলাপ রোধ করা। এআই-এর মাধ্যমে তৈরি করা পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট বা নগ্ন ছবি যদি কোনো ব্যক্তির সম্মতির বাইরে প্রকাশিত হয়, তবে সেটি এই আইনের আওতায় কঠোর শাস্তির বিধান রেখেছে। আইনটির গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এটি কেবল ভুক্তভোগীকে সুরক্ষা দেয় না, বরং এমন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধেও কড়া বার্তা দেয়।
ভারতের প্রেক্ষাপটেও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ধরনের বিজ্ঞাপনের প্রসার আটকাতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। চিনা সফটওয়্যার বা এআই টুলগুলির মাধ্যমে তথ্য চুরি এবং অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘকাল ধরেই আলোচনা চলছে। এ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের সচেতনতা সবথেকে বেশি জরুরি। কোনো সন্দেহজনক বিজ্ঞাপনে ক্লিক না করা এবং নিজের ব্যক্তিগত ছবি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করার আগে কয়েকবার ভাবার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। মেটার মতো প্ল্যাটফর্মগুলিকে এখন তাদের ফিল্টারিং সিস্টেম আরও শক্তিশালী করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে এমন জঘন্য বিজ্ঞাপনের কোনো জায়গা না থাকে।
এই ঘটনার পর থেকে বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে আইনি কড়াকড়ি বাড়ানোর দাবি উঠেছে। মেটার তরফে যদিও জানানো হয়েছে যে, তারা বিজ্ঞাপন নীতি খতিয়ে দেখছে এবং এই ধরনের অপরাধীদের চিহ্নিত করে প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইন এবং সুরক্ষাব্যবস্থা এখনো অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। আগামী দিনে ‘নিউডিফাই’ বা এই জাতীয় এআই প্রযুক্তির কবল থেকে রক্ষা পেতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশিত। সংশ্লিষ্ট ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কী ধরনের প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তবে সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্টিদের এই ব্যর্থতা নিঃসন্দেহে ডিজিটাল দুনিয়ার নিরাপত্তার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। চিনা কানেকশনের বিষয়টি সামনে আসার পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও পুরো পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা বজায় রাখতে ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করতে কঠোর আন্তর্জাতিক নীতি এখন সময়ের দাবি।







