কলকাতা: তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, লোকসভা নির্বাচন প্রক্রিয়া চলাকালীন নির্বাচন কমিশনের (EC) নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে ধারাবাহিক প্রশ্ন তুলেছেন। সম্প্রতি, তাঁর অভিযোগের তীর সরাসরি কমিশনের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দিকে নিবদ্ধ হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে তারা আদালতের নির্দেশ মানছেন না এবং বিতর্কিত পদ্ধতিতে ভোটার তালিকা প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। এই অভিযোগগুলি রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থাপিত সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়টি হলো বিশেষ রোল পর্যবেক্ষক (Special Roll Observer) সি. মুরুগানের বিরুদ্ধে ওঠা নির্দিষ্ট অভিযোগ। টিএমসি নেতার দাবি, মুরুগান মাইক্রো অবজারভারদের একটি ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সরাসরি নির্দেশ জারি করছিলেন। এই নির্দেশগুলি ভোটার তালিকা থেকে নাম বাতিলের (Deletion) গ্রহণযোগ্যতা সংক্রান্ত। বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এই নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্যই ছিল ভোটার তালিকা থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অতিরিক্ত নাম বাদ দেওয়া, যা সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশাবলীর পরিপন্থী।
ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াটি ভারতের নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশিকার অধীনে সম্পন্ন হয়। ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক, যাতে কোনো বৈধ ভোটারের নাম ভুলবশত তালিকা থেকে বাদ না পড়ে। সুপ্রিম কোর্ট অতীতে একাধিকবার এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছে। টিএমসির অভিযোগ, মুরুগানের এই পদক্ষেপ সেই স্বচ্ছতার উপর সরাসরি আঘাত হানছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, এই ধরনের কার্যকলাপ প্রমাণ করে যে কমিশনের কিছু অংশ ক্ষমতাসীন দল বা তাদের অনুগত কর্মকর্তাদের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, যার ফলে রাজ্যের সংখ্যালঘু বা দুর্বল অংশের ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এই ধরনের হস্তক্ষেপ রাজ্যের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য মারাত্মক হুমকি বলে মনে করছে তৃণমূল। তারা জানতে চেয়েছে, কেন একজন উচ্চপদস্থ পর্যবেক্ষক প্রকাশ্যে নির্দেশ না দিয়ে ব্যক্তিগত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন, যা পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।
এই প্রসঙ্গে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় জোর দিয়ে বলেছেন যে নির্বাচন কমিশনের এই কার্যকলাপ শুধুমাত্র প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি সুপ্রিম কোর্টের কর্তৃত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার শামিল। তিনি দাবি করেন, সাধারণ প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে হোয়াটসঅ্যাপের মতো ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করে নির্দেশ দেওয়া অত্যন্ত ‘বিচক্ষণতা’র পরিচায়ক। এই ধরনের গোপনীয় কার্যকলাপ ইঙ্গিত দেয় যে কমিশনের অভ্যন্তরে এমন প্রক্রিয়া চলছে যা তারা প্রকাশ্যে আনতে চায় না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ঠিক আগে এই ধরনের গুরুতর অভিযোগ কমিশন এবং রাজ্য প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করে। টিএমসি সবসময়ই অভিযোগ করেছে যে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি পক্ষপাতিত্ব করছে। যদিও নির্বাচন কমিশন বা অভিযুক্ত আধিকারিকদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এই নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে কমিশনের ভূমিকা সর্বদা কঠোর scrutiny বা নিবিড় পর্যবেক্ষণের অধীনে থাকে। বিশেষত, ভোটার তালিকা সংশোধন একটি স্পর্শকাতর বিষয়, কারণ এর ওপর নির্ভর করে নির্বাচনের ফলাফল।
তৃণমূলের অভিযোগের প্রেক্ষিতে, বিরোধী দলগুলি নির্বাচন কমিশনের কাছে সি. মুরুগানের ভূমিকা এবং হোয়াটসঅ্যাপ যোগাযোগের বিষয়ে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা দাবি করতে পারে। যদি অভিযোগগুলি প্রমাণিত হয়, তবে এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করবে। কমিশনকে এখন দ্রুত এই অভিযোগগুলির বিষয়ে তদন্ত করে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে। বিরোধীরা জানতে চাইছে, এই ধরনের নির্দেশনার ফলে কতজন ভোটারের নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে এবং কেন এই প্রক্রিয়াটি মাইক্রো অবজারভারদের মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে পরিচালনা করা হচ্ছিল।
রাজ্যে লোকসভা নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য কমিশন যে বিপুল সংখ্যক পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে, তাদের নিরপেক্ষতা সর্বাগ্রে কাম্য। একজন বিশেষ রোল পর্যবেক্ষকের বিরুদ্ধে তালিকা সংশোধনে কারসাজির অভিযোগ ওঠায়, সেই পর্যবেক্ষকদের সামগ্রিক ভূমিকার উপর প্রশ্নচিহ্ন পড়েছে। তৃণমূলের দাবি, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে কমিশনের কিছু আধিকারিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কাজ করছেন এবং ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করতে চাইছেন। দল আরও বলেছে যে তারা এই বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের উচ্চ পর্যায়ে এবং প্রয়োজনে সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিতভাবে জানাবে। নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের এই গুরুতর অভিযোগগুলি রাজ্যের সামগ্রিক নির্বাচনী পরিবেশের উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যখন ভোটের দিনক্ষণ এগিয়ে আসছে, তখন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক।
এই ধরনের অভিযোগগুলি প্রমাণ করে যে রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে অবিশ্বাস ও সন্দেহ গভীর হচ্ছে, যা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য অনুকূল নয়। কমিশনকে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হলে এই অভিযোগগুলির বিষয়ে দ্রুত এবং জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করেও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের চেষ্টা হতে পারে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুতর দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। কমিশনের উচিত তাৎক্ষণিকভাবে ওই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ এবং সি. মুরুগানের কার্যকলাপের উপর নজরদারি শুরু করা। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত প্রতিটি যোগাযোগ মাধ্যম যেন বিধিসম্মত থাকে, তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এই ধরনের পদক্ষেপগুলি ভোটারদের মনে কমিশনের প্রতি আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করবে। রাজ্যের নির্বাচনী আবহে এই অভিযোগগুলি নিঃসন্দেহে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।








