কলকাতা: বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে মুহূর্তের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেড়েছে বহুগুণ। তেমনই এক ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছিলেন বছর তিপান্নর মহাদেব ভুইয়া। কিন্তু সব মেঘ কেটে গিয়ে দীর্ঘ দেড় দশক পর ঘরে ফিরলেন তিনি। আর এই অসাধ্য সাধন করলেন পশ্চিমবঙ্গের ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাবের (WBRC) সদস্যরা।
ঘটনার সূত্রপাত কয়েকদিন আগে যখন ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার বারিপদা এলাকায় স্থানীয় গ্রামবাসীরা মহাদেব ভুইয়াকে লক্ষ্য করেন। দীর্ঘকায় দাড়ি, এলোমেলো পোশাক আর অসংলগ্ন কথাবার্তার কারণে স্থানীয়দের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। মুহূর্তের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে এলাকায় ছেলেধরা বা শিশু চোর ঢুকেছে। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা তাকে ঘিরে ধরেন এবং পুলিশে খবর দেওয়ার উপক্রম হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার মাঝেই খবর পৌঁছায় হ্যাম রেডিওর অপারেটরদের কাছে।
ওয়েস্ট বেঙ্গল রেডিও ক্লাবের সম্পাদক অম্বরীশ নাগ বিশ্বাস জানান, তারা খবর পাওয়া মাত্রই ময়ূরভঞ্জ পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ব্যক্তিকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসা হয়। এরপর শুরু হয় তার পরিচয় খোঁজার কাজ। প্রথম দিকে তিনি খুব একটা সহযোগিতা করতে পারছিলেন না। তবে দীর্ঘ সময়ের ধৈর্যশীল কথোপকথনের পর তার মুখ থেকে ‘পুরুলিয়া’ শব্দটি শোনা যায়। এই সামান্য সূত্র ধরেই শুরু হয় এক বিশাল কর্মযজ্ঞ।
হ্যাম অপারেটররা পুরুলিয়া জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে খোঁজ শুরু করেন। জানা যায়, পুরুলিয়া জেলার মানবাজার থানার অন্তর্গত একটি গ্রামের বাসিন্দা হলেন এই মহাদেব। ১৫ বছর আগে তিনি হঠাৎ করেই বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘ সময় ধরে তার খোঁজ চালিয়েছেন, থানায় নিখোঁজ ডায়েরিও করা হয়েছিল, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। দীর্ঘ ১৫ বছরে তার চেহারার আমূল পরিবর্তন হওয়ায় প্রথমে অনেকেই চিনতে পারছিলেন না।
এরপর প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়। বর্তমান ছবি এবং পরিবারের কাছে থাকা পুরনো ছবির মধ্যে সামঞ্জস্য খোঁজা হয়। মহাদেবের পরিবারের লোকেদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলানো হয়। নিজের ভাই ও পরিজনদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। দীর্ঘ বিস্মৃতির পর্দা সরিয়ে একে একে স্মৃতির হাড়িকাঠ থেকে নামগুলো বেরিয়ে আসতে শুরু করে। অবশেষে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তিনিই সেই নিখোঁজ ব্যক্তি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মহাদেব কিছুটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন ১৫ বছর আগে। একদিন ঘর থেকে বেরিয়ে আর ফেরেননি। তারা ভেবেছিলেন হয়তো কোনো বড় দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু হ্যাম রেডিওর সদস্যরা যেভাবে তাকে খুঁজে বের করে আজ ফিরিয়ে দিলেন, তাকে তারা মিরাকল বা অলৌকিক ঘটনা বলেই মনে করছেন।
বারিপদা থেকে একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল ও পরিবারের সদস্যরা গিয়ে মহাদেবকে নিয়ে আসেন। তবে এই ঘটনা আবার একবার সামনে এনে দিল কীভাবে গুজব একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন বিপন্ন করতে পারে। একইসঙ্গে প্রমাণিত হলো যে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও সদিচ্ছা থাকলে হারিয়ে যাওয়া মানুষকেও তার শিকড়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমানে মহাদেব ভুইয়া তার নিজের বাড়িতে সুস্থ আছেন এবং দীর্ঘ ১৫ বছরের নিঃসঙ্গতার অবসান ঘটেছে।








